সিপাহী-জনতার ঐক্যবদ্ধ ভূমিকার মধ্য দিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার ঘটনা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে এ দিনের গুরুত্ব অপরিসীম। জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেশ গঠনে এগিয়ে যেতে হবে। দিল্লি নয়, পিন্ডি নয়, অন্য কোনো দেশ নয়—সবার আগে বাংলাদেশ। গতকাল শনিবার জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সাহসিকতা ও দেশপ্রেমের পরিচয় দিয়েছেন। স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে চূড়ান্ত বিজয় পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর এই অবদান বাংলাদেশের মানুষ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে মীর হেলাল বলেন, স্বাধীনতার পর দেশ নানা রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এমন পরিস্থিতিতে সশস্ত্র চক্রান্তের মাধ্যমে জিয়াউর রহমানকে আটক করা হয়। পরে সিপাহী-জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে তাঁকে মুক্ত করেন। এর মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবদান তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে তিনি দেশের সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করেছিলেন। এমনকি আওয়ামী লীগও এ ব্যবস্থার আওতায় রাজনীতি করার সুযোগ পেয়েছিল। ইতিহাসের মহানায়ক কাগজে-কলমে তৈরি করা যায় না; মানুষের জন্য অবদান, দেশপ্রেম ও ঐতিহাসিক ভূমিকার মধ্য দিয়েই একজন মানুষ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম তিনটি ভিত্তি কৃষি, প্রবাসী আয় ও তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশে জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এসব খাত দেশের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করতে ভূমিকা রেখেছে। তবে দীর্ঘ সময় পরও এসব খাতের বাইরে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সৃষ্টিতে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
বর্তমান সরকারের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থনীতিকে বহুমাত্রিক ও গতিশীল করতে নতুন নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। ফ্রিল্যান্সিং, তথ্যপ্রযুক্তি, বিশেষায়িত শিল্প ও ক্রীড়াসহ সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী। অথচ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। নারীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, কর্মক্ষেত্রে সুরক্ষা, ন্যায্য বেতন ও সম্মানী নিশ্চিত করতে হবে। নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা গেলে দেশের অর্থনীতিতে নতুন শক্তি যুক্ত হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের ফ্যামিলি কার্ডসহ সামাজিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগ নারীর ক্ষমতায়ন ও পারিবারিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদারে ভূমিকা রাখবে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দেশের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে মীর হেলাল বলেন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে যথাযথভাবে জানাতে হবে। দেশপ্রেম, সাহসিকতা ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ধারণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মানুষের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই রাষ্ট্র পরিচালনা ও দেশ গঠনের পরিকল্পনা নিতে হবে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের চট্টগ্রাম জেলা সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন এবং চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী। এ ছাড়া প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে দিবসটি উপলক্ষে বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। আলোচনা সভা শেষে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় বিজয়ী শিক্ষার্থী ও অংশগ্রহণকারীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রতিমন্ত্রী।
অন্যদিকে, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রাম নগরের কাজীর দেউড়িতে জিয়া স্মৃতি জাদুঘর মিলনায়তনে পৃথক আলোচনা সভার আয়োজন করে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) চট্টগ্রাম শাখা। এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক চেতনা থেকে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানুষের মৌলিক অধিকার এবং জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার শিক্ষা নিতে হবে।
চসিক প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ৭ নভেম্বরের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্রীয় সংকট, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং সিপাহী-জনতার ঐক্যবদ্ধ ভূমিকার দীর্ঘ ইতিহাস জড়িত। মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের ভূমিকা, ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তাঁর অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে চসিক প্রশাসক বলেন, ওই বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ও পাল্টাপাল্টি অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ২ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত ঘটনাবলি দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ৭ নভেম্বর জিয়াউর রহমানকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করার মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নতুন মোড় নেয়।
জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন। কৃষি, তৈরি পোশাকশিল্প ও প্রবাসী আয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতের বিকাশেও তাঁর নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের প্রভাব রয়েছে। বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ভূমিকার কথা উল্লেখ করে ডা. শাহাদাত বলেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০০৭-০৮ সালের রাজনৈতিক সংকট পর্যন্ত গণতন্ত্র ও দেশের স্বাধীন রাজনৈতিক অবস্থান রক্ষায় তিনি আপসহীন ভূমিকা পালন করেছেন।
বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের সার্বিক উন্নয়নে শৃঙ্খলা, সময়ানুবর্তিতা, জবাবদিহি ও কর্মদক্ষতার বিকল্প নেই। রাষ্ট্রকে কার্যকরভাবে পরিবর্তন করতে হলে সর্বস্তরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পাশাপাশি কৃষক, শ্রমিক, নারী, যুবসমাজ ও সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ৭ নভেম্বরের চেতনার অন্যতম শিক্ষা হলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, পরমতসহিষ্ণুতা নিশ্চিত করা এবং মানুষের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করা। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নারী ও কৃষকের ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।
ড্যাবের নেতাদের উদ্দেশে চসিক প্রশাসক বলেন, চিকিৎসকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানুষের কল্যাণে সামাজিক ও গবেষণামূলক কর্মকাণ্ডেও সম্পৃক্ত হতে হবে। এ ধরনের আলোচনা সভা নিয়মিত আয়োজনের পাশাপাশি ইতিহাস, স্বাস্থ্য, সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে গবেষণা ও গঠনমূলক আলোচনার জন্য একটি গবেষণা সেল গঠন করা প্রয়োজন।
বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক ডা. রাসেল ফরিদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং সদস্যসচিব ডা. কাজী শামীম আল মামুনের সঞ্চালনায় সভায় বক্তব্য দেন চমেক ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক ডা. জসিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম জেলা ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক ডা. তমিজ উদ্দিন আহমেদ মানিক, মহানগর ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক ডা. আব্বাস উদ্দিন, চট্টগ্রাম সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের সদস্যসচিব ডা. খুরশিদ জামিল চৌধুরী, চমেক ড্যাবের সাধারণ সম্পাদক ডা. ফয়েজুর রহমান, জেলা ড্যাবের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. বেলায়েত হোসেন ঢালী, মহানগর ড্যাবের সাধারণ সম্পাদক ডা. এস এম ইফতেখারুল ইসলাম, ড্যাবের উপদেষ্টা ডা. আবদুল মোত্তালিব, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল অধ্যাপক ডা. আনিসুল হোসেন, মহানগর ড্যাবের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ডা. এস এম সারোয়ার আলম, সহসভাপতি ডা. নুরুল করিম চৌধুরী এবং ড্যাব চট্টগ্রাম জেলার সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ডা. ইমরোজ উদ্দিন প্রমুখ।