রাখাইন পাহাড়ে গর্জে ওঠা গোলাগুলির শব্দ এখন আর শুধু যুদ্ধের প্রতিধ্বনি নয়, সেটি হয়ে উঠেছে মাদক সাম্রাজ্যের নতুন ইতিহাসের অংশ। মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের ধারাবাহিকতায় বদলে গেছে দেশটির মাদক বাণিজ্যের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ। ক্ষমতার পালাবদলে ইয়াবার নিয়ন্ত্রণ এখন সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে—যারা বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে।
এক সময় যেখানে ইয়াবা উৎপাদনের পেছনে মিয়ানমার সামরিক জান্তার ছত্রচ্ছায়া ছিল, আজ সেখানে কমিশনের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি পেশাদার কারবার গড়ে তুলেছে আরাকান আর্মি। সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে কোটি কোটি ইয়াবা ট্যাবলেট—নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে, কখনো নাফ নদী দিয়ে, কখনো সমুদ্রপথে, আবার কখনো কাঠ আমদানির আড়ালে আর্থিক লেনদেনের কৌশলে।
২৬ জুন, বিশ্ব মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য—“প্রমাণ স্পষ্ট: প্রতিরোধে বিনিয়োগ করুন, চক্রটি ভেঙে দিন।” তবে বাংলাদেশে এই প্রতিরোধের কণ্ঠ যতটা জোরালো, বাস্তবতা ঠিক ততটাই দুঃখজনক।
২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ পিস ইয়াবা জব্দ হয়েছে, যার প্রায় পুরোটাই এসেছে মিয়ানমার থেকে।বিজিবির রামু সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, “ওপারে যেই-ই থাকুক—আরাকান আর্মি, জান্তা বা অন্য কেউ—আমাদের নীতি স্পষ্ট: জিরো টলারেন্স।”
কিন্তু সীমান্ত পরিস্থিতি যেভাবে জটিল হয়ে উঠছে, তা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নয়, গোটা রাষ্ট্রের জন্যই চ্যালেঞ্জ। বিশেষত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পালাবদলের পর গা-ঢাকা দেওয়া চিহ্নিত মাদক কারবারিরা আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে, নতুন চ্যানেল গড়ে তুলছে, যেটা বিপজ্জনক বার্তা বহন করে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইয়াবা তো আছেই—এখন আইস, হেরোইনসহ বিভিন্ন সিনথেটিক ড্রাগও ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে।সাম্প্রতিককালে নাফ নদী জেলেদের জন্য উন্মুক্ত হওয়ায় নতুন রুট তৈরি করেছে পাচারকারীরা। কুয়াকাটা উপকূলে সমুদ্রপথে আসছে বড় চালান। মিয়ানমার থেকে কাঠ বা অন্য পণ্যের আমদানি হচ্ছে, আর সেই আড়ালে চলছে মাদকের মূল্য পরিশোধ।
মাদকবিরোধী অভিযানে প্রশাসনের কণ্ঠস্বর যত উচ্চকিত, বিচার ব্যবস্থার চিত্র ততটাই হতাশাজনক।মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) জানায়, গত পাঁচ বছর পাঁচ মাসে নিষ্পত্তি হওয়া ১৩,৬৪১টি মামলার মধ্যে ৭,৬৬৫টি মামলায় সব আসামিই খালাস পেয়েছেন। অর্থাৎ প্রায় ৫৬ শতাংশ মামলায় কোনো সাজাই হয়নি। পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকা, দুর্বল তদন্ত, এবং বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা—এই চক্রে বারবার রেহাই পাচ্ছে অপরাধীরা। ফলে তারা আবার ফিরে যাচ্ছে মাদক ব্যবসার ছায়ামহলে।
২০০৯–২০২৫ (এপ্রিল পর্যন্ত): গ্রেপ্তার প্রায় ১৫ লাখ, মামলা প্রায় ১২ লাখ, উদ্ধার ইয়াবা ৪০ কোটির বেশি, হেরোইন সাড়ে ৪ হাজার কেজি, কোকেন ২০৫ কেজি। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪-এ ইয়াবা উদ্ধার কমেছে ৪৭ শতাংশ (ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা)।
দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, “যুবসমাজের একটি বড় অংশ মাদকের কবলে পড়ে সৃজনশীলতা হারাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর।তাঁর আহ্বান—মাদকমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে চাই সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন। প্রমাণ স্পষ্ট, এখন সময় চক্রটি ভেঙে দেওয়ার।
মাদকের ভয়াবহ বিস্তার এখন আর কেবল অপরাধ নয়—এ এক নিখুঁত সংগঠিত নেটওয়ার্ক, যেখানে সীমান্ত, পণ্য, রাজনীতি, বিচার, এমনকি সমাজও কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় শুধু শ্লোগান নয়, প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা, নীতিগত কঠোরতা ও নাগরিক ঐক্য।
