বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে এ বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১৪ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে পর্যটন অবকাঠামো, আবাসন, আতিথেয়তা ও সংশ্লিষ্ট সেবায় নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিক বিনিয়োগ প্রস্তাব জমা পড়েনি; ফলে প্রকল্পের ধরন, সম্ভাব্য স্থান, বাস্তবায়নকাল ও কর্মসংস্থানের পরিমাণও স্পষ্ট নয়।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে বাংলাদেশ সচিবালয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সঙ্গে বৈঠকে জাপানি বিনিয়োগকারীরা এ পরিকল্পনার কথা জানান। মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনা নিয়ে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তাঁরা। পর্যটন অবকাঠামো ও আতিথেয়তাসংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধা উন্নয়নেও সরকারের সঙ্গে কাজ করতে চান জাপানি বিনিয়োগকারীরা।
প্রস্তাব পেলে দ্রুত পদক্ষেপ
বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে পর্যটনমন্ত্রী বলেন, জাপানি বিনিয়োগকারীদের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাওয়ার পর সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। পারস্পরিক লাভজনক সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে পর্যটন খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সরকার আগ্রহী।
মন্ত্রী বলেন, বিনিয়োগকারী ও বাংলাদেশ—উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে এমন কাঠামোর মাধ্যমে বিনিয়োগ বাস্তবায়নে সরকার কাজ করবে। পর্যটন অবকাঠামো ও সেবার মান উন্নয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণেও সরকারের অঙ্গীকার রয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা এবং বাস্তবে অর্থ ছাড় বা প্রকল্প বাস্তবায়ন এক বিষয় নয়। প্রস্তাবের আর্থিক কাঠামো, বিনিয়োগকারীদের পরিচয় ও সক্ষমতা, প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়ন এবং সরকারি অনুমোদনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার পরই এ বিনিয়োগের বাস্তব অগ্রগতি মূল্যায়ন করা যাবে।
সম্ভাবনা আছে, চ্যালেঞ্জও কম নয়
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। সুন্দরবন, কক্সবাজারের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত এবং সিলেটের চা-বাগান আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এর পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, নদী, হাওর ও গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্র ঘিরেও পর্যটন পণ্য ও সেবা বিকাশের সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু এসব সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে রূপ দিতে প্রয়োজন উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, মানসম্মত আবাসন, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, দক্ষ জনবল এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রের ধারণক্ষমতা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়াও জরুরি।
বিশেষ করে উপকূলীয় ও বনাঞ্চলসংলগ্ন এলাকায় অপরিকল্পিত স্থাপনা পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। তাই নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
জাপানের প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর প্রত্যাশা
বৈঠকে পর্যটনমন্ত্রী জাপানকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, পর্যটন খাতেও জাপানি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
জাপানি প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তোলার আগ্রহ পুনর্ব্যক্ত করেন। সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র পরিদর্শন এবং বিনিয়োগের সুযোগ মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন মন্ত্রী।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) একটি প্রতিনিধিদল জাপানি বিনিয়োগকারীদের সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্র পরিদর্শনে সহযোগিতা করবে বলে জানান তিনি।
এখন নজর আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবে
প্রস্তাবিত ১২০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ নিয়ে পরবর্তী অগ্রগতি নির্ভর করছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা, প্রকল্প নির্বাচন, অর্থায়নের শর্ত এবং সরকারের মূল্যায়নের ওপর। বিনিয়োগটি চূড়ান্ত হলে পর্যটন অবকাঠামো ও আতিথেয়তা খাতে নতুন সক্ষমতা তৈরির পাশাপাশি কর্মসংস্থান, স্থানীয় ব্যবসা এবং সংশ্লিষ্ট সেবার চাহিদা বাড়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
তবে বিনিয়োগের অর্থ কোন কোন প্রকল্পে ব্যয় হবে, কত ধাপে তা বাস্তবায়িত হবে এবং কত কর্মসংস্থান তৈরি হবে—এসব বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ঘোষিত বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে বাস্তব প্রকল্পে রূপ দিতে পরবর্তী আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপই হবে গুরুত্বপূর্ণ।