মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

এক বছরে ৮৪৫ টাকা বেড়েছে এলপিজির দাম, দুই মাসে ৪৭৫ টাকা বৃদ্ধি, ১২ কেজির সিলিন্ডার এখন ২ হাজার ৬০ টাকা;

বাজারে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সংকট ও বাড়তি দামের অভিযোগের মধ্যেই আবারও মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এক বছরের ব্যবধানে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে ৮৪৫ টাকা।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

২০২৫ সালের নভেম্বরে ১ হাজার ২১৫ টাকার সিলিন্ডারটির দাম এখন ২ হাজার ৬০ টাকা। অর্থাৎ এক বছরে দাম বেড়েছে প্রায় ৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু অক্টোবর ও নভেম্বর—এই দুই মাসেই দাম বেড়েছে ৪৭৫ টাকা। রান্নার জ্বালানির এই ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধিতে বাড়তি চাপে পড়েছেন সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ক্রেতারা।

সোমবার (২ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নভেম্বর মাসের জন্য এলপিজির নতুন মূল্যহার ঘোষণা করে বিইআরসি। রাত ৮টা থেকে নতুন দর কার্যকর হয়েছে। এতে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ৪ অক্টোবর একই সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বিইআরসির হিসাবে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির কাঁচামাল প্রোপেন ও বিউটেনের দাম বৃদ্ধির কারণে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম বাড়ার কথা ছিল প্রায় ৭৪ টাকা। কিন্তু কমিশনের ঘোষিত খুচরা মূল্য বেড়েছে ২২৩ টাকা। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবের বাইরে আরও ১৪৯ টাকা যুক্ত হয়েছে নতুন দরে। আমদানিকারক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের বিভিন্ন পর্যায়ের চার্জ পুনর্নির্ধারণের কারণে এই ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

বিইআরসির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নভেম্বর মাসের জন্য বেসরকারি এলপিজির দাম প্রতি কেজি ১৭১ টাকা ৬৮ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। সৌদি আরামকো ঘোষিত মূল্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে প্রতি মেট্রিক টন প্রোপেনের দাম ৭২০ মার্কিন ডলার এবং বিউটেনের দাম ৭৮০ ডলার। দুই উপাদানের মিশ্রণ অনুপাত ৩৫:৬৫ বিবেচনায় গড় সৌদি চুক্তিমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রতি মেট্রিক টন ৭৫৯ ডলার।

এর সঙ্গে আমদানির জাহাজভাড়া ও ব্যবসায়ীদের প্রিমিয়াম বাবদ প্রতি মেট্রিক টনে ২৫০ ডলার এবং ডলারের বিনিময় মূল্য ১২৩ টাকা ৪৬ পয়সা হিসাব করা হয়েছে। অক্টোবরের তুলনায় নভেম্বর মাসে সৌদি চুক্তিমূল্য প্রতি মেট্রিক টনে গড়ে ৪৬ দশমিক ৫০ ডলার বেড়েছে। বিইআরসির হিসাবে, এর প্রভাবে মূসকসহ ১২ কেজির বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ার কথা প্রায় ৭৪ টাকা।

তবে নতুন দর নির্ধারণে শুধু আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধিই বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। এলপিজির মজুতকরণ, বোতলজাতকরণ, বিতরণ ও খুচরা বিক্রির চার্জও পুনর্নির্ধারণ করেছে কমিশন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়ার তুলনায় খুচরা পর্যায়ে সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে প্রায় তিন গুণ।

বিইআরসির ঘোষিত নতুন দর অনুযায়ী, ৫ কেজি থেকে ৪৫ কেজি পর্যন্ত বিভিন্ন আকারের বেসরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়ানো হয়েছে। নতুন মূল্যহার কার্যকর হওয়ায় বিভিন্ন আকারের সিলিন্ডার কিনতে ক্রেতাদের আগের চেয়ে বেশি অর্থ গুনতে হবে।

ঘোষিত নতুন দর অনুযায়ী, সাড়ে ৫ কেজির ৮৪২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯৪৪ টাকা, সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯১৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৪৬ টাকা, ১৫ কেজির ২ হাজার ২৯৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৫৭৫ টাকা, ১৬ কেজির ২ হাজার ৪৪৯ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৭৮৭, ১৮ কেজির ২ হাজার ৭৫৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার ৯০ টাকা, ২০ কেজির ৩ হাজার ৬১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার ৪৩৪, ২২ কেজির ৩ হাজার ৩৬৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার ৭৭৭, ২৫ কেজির ৩ হাজার ৮২৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ হাজার ২৯২ টাকা, ৩০ কেজির ৪ হাজার ৫৯২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ১৫০ টাকা, ৩৩ কেজির ৫ হাজার ৫১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার ৬৬৫ টাকা, ৩৫ কেজির ৫ হাজার ৩৫৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬ হাজার ৯ টাকা এবং ৪৫ কেজির ৬ হাজার ৮৮৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭ হাজার ৭২৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া বাসাবাড়িতে কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যবহার করা রেটিকুলেটেড পদ্ধতিতে সরকার করা এলপিজির দাম প্রতি লিটার শূন্য দশমিক ৩৩১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে শূন্য দশমিক ৩৬৮৫ টাকা করা হয়েছে। অটোগ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে।

এদিকে সরকারি এলপিজির দামও সমন্বয় করা হয়েছে। এলপি গ্যাস পিএলসি সরবরাহকৃত ১২ দশমিক ৫০ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৬০ টাকা। রেটিকুলেটেড পদ্ধতিতে সরবরাহ করা তরল এলপিজির দাম প্রতি কেজি ১৬৫ টাকা ৮৫ পয়সা এবং গ্যাসীয় অবস্থায় প্রতি ঘনমিটার ৩৬৮ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করেছে কমিশন।

নতুন দর অনুযায়ী, বেসরকারি এলপিজির মজুতকরণ ও বোতলজাতকরণ চার্জ প্রতি কেজি ২৩ টাকা ৪৮ পয়সা, ডিস্ট্রিবিউটর চার্জ ৭ টাকা ৮ পয়সা এবং রিটেইলার চার্জ ৫ টাকা ৮৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অটোগ্যাসের দামও বাড়ানো হয়েছে। প্রতি লিটার অটোগ্যাসের দাম ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯১ টাকা ৯৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।

অটোগ্যাসের মজুতকরণ চার্জ প্রতি লিটার ৫ টাকা ৫৯ পয়সা এবং স্টেশন চার্জ ৯ টাকা ২৫ পয়সা করা হয়েছে। গত ২৯ অক্টোবর এলপিজির মূল্য এবং মজুতকরণ, বোতলজাতকরণ ও বিতরণ চার্জ নিয়ে গণশুনানি করে বিইআরসি। শুনানিতে অপারেটর, ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা বিক্রেতারা বিভিন্ন পর্যায়ের চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব দেন।

কোম্পানিগুলো বোতলজাতকরণ চার্জ প্রতি কেজিতে ১৫ থেকে ১৬ টাকা বাড়িয়ে ২৫ থেকে ৩০ টাকা করার প্রস্তাব করে। ডিস্ট্রিবিউটররা চার্জ ৪ টাকা ১৭ পয়সা থেকে ৮ টাকা ৩৩ পয়সা এবং খুচরা বিক্রেতারা ৩ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে ১০ টাকা করার প্রস্তাব দেন। অন্যদিকে, ডিস্ট্রিবিউটররা ১২ কেজির সিলিন্ডারে নিজেদের চার্জ ৫০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা এবং খুচরা ব্যবসায়ীরা ৪৫ টাকা থেকে ৭০ টাকা করার প্রস্তাব করেন।

গণশুনানির পর বিইআরসির কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৭৬ টাকা করার সুপারিশ করেছিল। এতে সিলিন্ডারপ্রতি ১৩৯ টাকা বৃদ্ধির প্রস্তাব ছিল। পরে প্রস্তাব ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত পর্যালোচনা করে কমিশন নতুন মূল্যহার ঘোষণা করে।

কারিগরি কমিটির সুপারিশের তুলনায় চূড়ান্ত ঘোষিত দাম আরও ৮৪ টাকা বেশি। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় এবং সরবরাহব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ের চার্জ—সব মিলিয়ে নতুন মূল্যহার কার্যকর হয়েছে।

একদিকে বাজারে এলপিজির সংকট ও সরবরাহ নিয়ে অভিযোগ, অন্যদিকে ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি। এক বছরের মধ্যে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় গৃহস্থালি ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। রান্নার জ্বালানির এই বাড়তি খরচ সামলাতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর বাজেটে নতুন করে টান পড়বে।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন