মূল সংবাদে যান
জাতীয়

সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী কারাগারে, আইনের শাসন নাকি প্রতিশোধের ছায়া?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিশোধের সংস্কৃতি নতুন কিছু নয়। কিন্তু প্রতিবারই যখন ক্ষমতার পালাবদল হয়, তখন জনগণ একটি নতুন সূচনার আশা করে—আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার প্রত্যাশা নিয়ে।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী কারাগারে, আইনের শাসন নাকি প্রতিশোধের ছায়া?

সেই প্রত্যাশার জায়গাটিই আবার প্রশ্নের মুখে পড়ল সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী-এর গ্রেপ্তার ও কারাগারে পাঠানোর ঘটনায়।

একজন সাবেক স্পিকার—রাষ্ট্রীয় প্রোটোকলে যিনি দীর্ঘদিন তৃতীয় সর্বোচ্চ পদে ছিলেন—তাঁকে ভোররাতে একটি বাসা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পরে একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলো। এর আগে পরোয়ানা নেই, মামলার কাগজ নেই—এমন অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যায় না। প্রশ্ন হলো, এটি কি আইনের স্বাভাবিক প্রয়োগ, নাকি ক্ষমতার প্রদর্শন?

আইনের ভাষায় বলা যেতে পারে—তদন্তাধীন মামলায় গ্রেপ্তার বৈধ। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এর আরেকটি ব্যাখ্যা আছে—“selective enforcement” বা বাছাইকৃত প্রয়োগ। যখন আইনের প্রয়োগ ব্যক্তি ও পরিস্থিতি ভেদে ভিন্ন হয়ে যায়, তখন সেটি আইনের শাসন নয়, বরং ক্ষমতার শাসনে পরিণত হয়।

আরও উদ্বেগজনক হলো—যে মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, সেটি নতুন। অথচ তাঁর বিরুদ্ধে পুরোনো একাধিক মামলার কথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিজেই স্বীকার করেছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে—নতুন মামলার প্রয়োজন হলো কেন? এটি কি আইনি কৌশল, নাকি প্রশাসনিক সুবিধাবাদ?

adalot dhaka.png

এখনও সময় আছে—রাষ্ট্র যদি চায়, এই ঘটনাকে উদাহরণে পরিণত করতে পারে; অন্যথায় এটি হয়ে উঠবে আরেকটি দৃষ্টান্ত, যেখানে ক্ষমতা আইনের ওপর ছায়া ফেলে।

সন্দেহের সূত্রপাত -

আদালত প্রাঙ্গণে আইনজীবীদের পাল্টাপাল্টি স্লোগান—‘জয় বাংলা’ বনাম ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’—আসলে শুধু তাৎক্ষণিক উত্তেজনা নয়; এটি রাষ্ট্রের গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রতিফলন। বিচারালয়, যা হওয়া উচিত নিরপেক্ষতার প্রতীক, সেটিই যেন রাজনৈতিক সংঘাতের মঞ্চে পরিণত হচ্ছে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আরও মৌলিক—রাষ্ট্র কি তার দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে?

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার অঙ্গীকার করেছিল। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে নেতৃত্বদানকারী তারেক রহমান আইনের শাসন ও শান্তির কথা বলেছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতির ওপর ভর করেই জনগণের একটি অংশ তাদের আস্থা রেখেছিল।

কিন্তু বাস্তবতা যদি হয়—গভীর রাতে গ্রেপ্তার, অস্পষ্ট মামলা, এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কঠোরতা—তাহলে সেই আস্থা টিকবে কীভাবে?

শিরীন শারমিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর—হত্যাচেষ্টা, সহিংসতা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তিনি কি এমন একজন ব্যক্তি, যিনি নিজ হাতে এসব অপরাধ সংঘটিত করেছেন—নাকি এটি রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার একটি বিস্তৃত ব্যাখ্যা, যা অনেক সময় প্রমাণের আগেই শাস্তির রূপ নেয়?

এই প্রশ্নের উত্তর আদালত দেবে—এটাই কাম্য। কিন্তু আদালতের আগে যদি প্রক্রিয়াটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে, তাহলে বিচার কতটা বিশ্বাসযোগ্য থাকবে?

বাংলাদেশের ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে—আইনকে ব্যবহার করা হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার হাতিয়ার হিসেবে। সেই চক্র ভাঙার প্রতিশ্রুতি বহুবার এসেছে, কিন্তু বাস্তবায়ন খুব কমই হয়েছে। আজকের ঘটনাটি সেই পুরোনো আশঙ্কাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

রাষ্ট্রের উচিত এখনই পরিষ্কার অবস্থান নেওয়া— আইন কি সবার জন্য সমান, নাকি কারও জন্য দ্রুত, কারও জন্য ধীর?

শিরীন শারমিন চৌধুরীর জামিন, বিচার ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হওয়া এখন শুধু একটি মামলার প্রশ্ন নয়—এটি রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানের প্রশ্ন। কারণ, আইনের শাসন কেবল আদালতের রায়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না—এটি প্রতিষ্ঠিত হয় প্রক্রিয়ার ন্যায্যতায়, আচরণের সততায় এবং ক্ষমতার সংযমে।

এখনও সময় আছে—রাষ্ট্র যদি চায়, এই ঘটনাকে উদাহরণে পরিণত করতে পারে; অন্যথায় এটি হয়ে উঠবে আরেকটি দৃষ্টান্ত, যেখানে ক্ষমতা আইনের ওপর ছায়া ফেলে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী
  • কারাগারে

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন