রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জেলার ১০টি আসনের ফল ঘোষণা করেন। বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন নগরীর পাঁচটি আসনের ফল ঘোষণা করেন। চট্টগ্রাম-১১ আসনের ফল ঘোষণা করেন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো. বেলায়েত হোসেন চৌধুরী। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারী) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ শেষে রাতে বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করা হয়।
চট্টগ্রামে বিএনপির এই বড় জয়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়—জয়ী ১৪ জনের মধ্যে ১০ জনই নতুন মুখ। প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তাঁরা রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় সূচনা করতে যাচ্ছেন। নতুনদের মধ্যে রয়েছেন—চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) আসনে নুরুল আমিন, চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে সরোয়ার আলমগীর, চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে হুমাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) আসনে এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী) আসনে মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম-১০ (ডবলমুরিং-পাহাড়তলী) আসনে সাঈদ আল নোমান, চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে এনামুল হক এনাম এবং চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসনে জসীম উদ্দিন আহমদ।

তবে নবীনদের পাশাপাশি অভিজ্ঞ নেতারাও নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন। চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী টানা চতুর্থবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে তিনি ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও সংসদ সদস্য ছিলেন। চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে মোস্তফা কামাল পাশা টানা চতুর্থবারের মতো জয় পেয়েছেন। চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে সরওয়ার জামাল নিজাম পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে জামায়াতে ইসলামীর শাহজাহান চৌধুরী তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন। চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনেও জয় পেয়েছে জামায়াত।
ঘোষিত ফল অনুযায়ী— চট্টগ্রাম-১ আসনে নুরুল আমিন পেয়েছেন ১,২৮,৭৯৯ ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর ছাইফুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা) পেয়েছেন ৮৪,৫৩৮ ভোট। চট্টগ্রাম-২ আসনে সরোয়ার আলমগীর পেয়েছেন ১,৩৮,৫৪৫ ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ নুরুল আমিন (দাঁড়িপাল্লা) পেয়েছেন ৬২,১৬০ ভোট। চট্টগ্রাম-৩ আসনে মোস্তফা কামাল পাশা পেয়েছেন ৭৩,০৩৭ ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর আলাউদ্দীন সিকদার (দাঁড়িপাল্লা) পেয়েছেন ৩৯,৬৬২ ভোট। চট্টগ্রাম-৪ আসনে আসলাম চৌধুরী পেয়েছেন ১,৪২,৬৭৪ ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মো. আনোয়ার ছিদ্দিক (দাঁড়িপাল্লা) ৮৯,২৬৮ ভোট। চট্টগ্রাম-৫ আসনে মীর হেলাল উদ্দিন পেয়েছেন ১,১৬,৪৪০ ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী খেলাফত মজলিসের মাওলানা মো. নাসির উদ্দীন মুনির (রিকশা) পেয়েছেন ৩২,৭০৮ ভোট। চট্টগ্রাম-৬ আসনে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী পেয়েছেন ১,১১,২০১ ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী মোহাম্মদ ইলিয়াছ নূরী (মোমবাতি) ২৬,৬৯৭ ভোট। চট্টগ্রাম-৭ আসনে হুমাম কাদের চৌধুরী পেয়েছেন ১,০১,৪৪৫ ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর ডা. এটিএম রেজাউল করিম (দাঁড়িপাল্লা) ৪১,৭১৯ ভোট।
চট্টগ্রাম-৮ আসনে এরশাদ উল্লাহ পেয়েছেন ৭৯,২০৭ ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর ডা. আবু নাসের (দাঁড়িপাল্লা) ৩৪,৭৪৭ ভোট। চট্টগ্রাম-৯ আসনে আবু সুফিয়ান পেয়েছেন ১,০৯,৩৮৮ ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর ডা. একেএম ফজলুল হক (দাঁড়িপাল্লা) ৫৩,৪০৭ ভোট। চট্টগ্রাম-১০ আসনে সাঈদ আল নোমান পেয়েছেন ১,২১,৩৬৪ ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মুহাম্মদ শামসুজ্জমান হেলালী (দাঁড়িপাল্লা) পেয়েছেন ৭৪,৪০৭ ভোট। চট্টগ্রাম-১১ আসনে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী পেয়েছেন ১,১৫,০২১ ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ শফিউল আলম (দাঁড়িপাল্লা) ৭৩,৭৫২ ভোট। চট্টগ্রাম-১২ আসনে এনামুল হক এনাম পেয়েছেন ১,৩৫,০৪৪ ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী ফ্রন্টের ছৈয়দ এয়ার মোহাম্মদ পেয়ারু (মোমবাতি) ২৮,৯৯৯ ভোট। চট্টগ্রাম-১৩ আসনে সরওয়ার জামাল নিজাম পেয়েছেন ১,২৬,১৯২ ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ইসলামী ফ্রন্টের এসএম শাহজাহান (মোমবাতি) ৫১,৪৫০ ভোট। চট্টগ্রাম-১৪ আসনে জসীম উদ্দিন আহমদ পেয়েছেন ৭৬,৪৯৩ ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এলডিপির অধ্যাপক ওমর ফারুক (ছাতা) ৭৫,৪৬৭ ভোট। চট্টগ্রাম-১৫ আসনে শাহজাহান চৌধুরী পেয়েছেন ১,৮১,২৩৮ ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির নাজমুল মোস্তফা আমীন (ধানের শীষ) ১,৩০,৬৬১ ভোট। চট্টগ্রাম-১৬ আসনে মাওলানা জহিরুল ইসলাম পেয়েছেন ৯৩,১৬৭ ভোট এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পা (ধানের শীষ) ৮৩,১০৫ ভোট।
তবে নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মোহাম্মদ সানাউল্লাহ জানান, চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) ও চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনের ফল গেজেট আকারে প্রকাশ স্থগিত থাকবে। ঋণখেলাপির অভিযোগে দুই বিজয়ী প্রার্থীর প্রার্থিতা চ্যালেঞ্জ হওয়ায় বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। হাইকোর্ট তাঁদের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করলেও পরবর্তীতে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল গ্রহণ করা হয়েছে। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ফল গেজেট প্রকাশ করা যাবে না বলে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন।
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আপিল শুনানিতে প্রার্থিতা বৈধ প্রমাণিত হলে নির্বাচন কমিশন গেজেট প্রকাশ করবে। অন্যথায় আইনি প্রক্রিয়ায় পরবর্তী সিদ্ধান্ত আসবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েও আইনি জটিলতায় দুই আসনের প্রতিনিধিত্ব ঝুলে থাকায় ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আদালতের চূড়ান্ত রায়ের ওপরই এখন নির্ভর করছে ফটিকছড়ি ও সীতাকুণ্ড আসনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
