বন্দরনগরী শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, রাজনৈতিকভাবেও দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। ১৬টি সংসদীয় আসন নিয়ে গঠিত এই জেলার ফলাফল জাতীয় রাজনীতির ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলে। ফলে চট্টগ্রামের ভোটের হিসাব মানেই কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সমীকরণে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভোটকেন্দ্র প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা জোরদার ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করার কাজ প্রায় শেষ। সবকিছু প্রস্তুত থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে একটাই প্রশ্ন— একটাই—সংখ্যার খেলায় শেষ পর্যন্ত কার পাল্লা ভারী হবে কিংবা শেষ হাসি কে হাসবে?

চট্টগ্রাম ঐতিহাসিকভাবে ক্ষমতার পালাবদলের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বন্দর কার্যক্রম, শিল্পাঞ্চল ও প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে এখানকার ভোটের প্রভাব সরাসরি জাতীয় অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হয়। চট্টগ্রামের নগর আসনগুলোতে ভোট বিভাজনই ফলাফল নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে। কয়েকটি আসনে দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর শক্ত অবস্থান প্রধান দুই শক্তির ভোটব্যাংকে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, “চট্টগ্রামের ফলাফল অনেক সময় জাতীয় প্রবণতার ইঙ্গিত দেয়।” এবারও তার ব্যতিক্রম হওয়ার সম্ভাবনা কম।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধি জারির পর থেকে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করায় জেলার সার্বিক পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল রয়েছে। চট্টগ্রাম জেলায় মোট ভোটার সংখ্যা প্রায় ৬৬ লাখ ৮২ হাজার ৫১৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩৪ লাখ ৮৩ হাজার ৮৭৭ জন। নারী ভোটার ৩১ লাখ ৯৮ হাজার ৫৭০ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছে ৭০ জন। এসব ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন জেলার মোট ১ হাজার ৯৬৫টি ভোটকেন্দ্রে।

এবারের নির্বাচনের লক্ষ্য কেবল ভোটগ্রহণ ও ফলাফল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রতিটি ভোটার যেন উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তাদের সুচিন্তিত মতামত প্রকাশ করতে পারেন এবং নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন-সেই নিশ্চয়তা প্রদানই প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার। সীতাকুণ্ড ও রাউজানের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাসহ প্রতিটি উপজেলা বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং কোনো ধরনের উদ্বেগের ইঙ্গিত পাওয়া গেলে তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে পুরো চট্টগ্রাম জেলাকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মাঠে রয়েছে ৪০ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য এবং প্রায় ১১৫ জন জুডিশিয়াল ও অ্যাক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট। প্রত্যেক ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে স্ট্রাইকিং ফোর্স কাজ করছে এবং তারা সার্বক্ষণিক টহল ও মুভমেন্টের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। নিয়মিত তল্লাশি অভিযানের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে কিছু অর্থ জব্দ করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ভোটকেন্দ্র স্থাপন, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, ব্যালট ও নির্বাচনী সরঞ্জাম বিতরণ—সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। প্রশাসনের দাবি, “শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।” তবে অতীত অভিজ্ঞতা এবং সাম্প্রতিক কয়েকটি সংঘর্ষের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ রয়ে গেছে।
চট্টগ্রামের অধিকাংশ আসনে এবার সরল দ্বিমুখী লড়াই নয়। বিএনপি, জামায়াত ও অন্যান্য বিরোধী শক্তির পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উপস্থিতি ভোটের অঙ্ক জটিল করে তুলেছে। নগরের কয়েকটি আসনে শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রধান দলগুলোর ভোটব্যাংকে ফাটল ধরাতে পারেন—এমন আশঙ্কা রয়েছে রাজনৈতিক মহলে। বিশ্লেষকদের মতে, যেখানে বিরোধী ভোট ঐক্যবদ্ধ নয়, সেখানে ভোট বিভাজনই ফল নির্ধারণ করবে। অন্যদিকে, গ্রামীণ আসনে প্রার্থীর ব্যক্তিগত প্রভাব, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামের নগর আসনগুলোতে ভোট বিভাজনই ফলাফল নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নগর ও জেলার কয়েকটি আসনে দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ রয়েছে। দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর শক্ত অবস্থান প্রধান দুই শক্তির ভোটব্যাংকে প্রভাব ফেলতে পারে। কোথাও বিদ্রোহী প্রার্থী মাঠে রয়েছেন, কোথাও আবার নীরব অসন্তোষ সাংগঠনিক কর্মতৎপরতায় প্রভাব ফেলছে। অতীতে দেখা গেছে, চট্টগ্রামে অল্প ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়েছে। ফলে দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবারও ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান, পিএসসি, অধিনায়ক র্যাব-৭ জানান, জনসাধারণকে জড়তা ও ভীতি মুক্ত হয়ে নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোট প্রদানের আহ্বান জানাচ্ছি। আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে সঠিক নেতৃত্ব নির্বাচনে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। যেকোনো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করা হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন। আসন্ন নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে যেকোনো সহিংসতা বা নাশকতার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে তারা বদ্ধপরিকর। শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি ও সতর্কতা অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্ন করতে সবার সহযোগিতাও কামনা করেছি।
চট্টগ্রামে নতুন ভোটারের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করে নগর এলাকায় তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং তাদের ইস্যুভিত্তিক অবস্থান ফলাফলে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, নগর সেবার মান, যানজট ও পরিবেশ—এসব ইস্যু তরুণদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, যে দল তরুণ ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে পারবে, তাদের জন্য কয়েকটি আসনে অপ্রত্যাশিত সাফল্য আসতে পারে।
গত কয়েক সপ্তাহে বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ, মিছিল-পাল্টা মিছিল, অভিযোগ ও প্রচারণা ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে বিভিন্ন এলাকায়। যদিও প্রশাসন শান্তিপূর্ণ ভোটের আশ্বাস দিচ্ছে, তবুও ভোটের দিন ও ফল-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেখানে তীব্র, সেখানে ফলাফল ঘোষণার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও ভোটার উপস্থিতির হার এবার বড় সূচক হয়ে দাঁড়াতে পারে। ভোটাররা যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেন্দ্রে যান এবং ফলাফল মেনে নেওয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতি বজায় থাকে, তবে তা জাতীয় পর্যায়েও ইতিবাচক বার্তা দেবে।
সব প্রস্তুতি সম্পন্ন—প্রশাসন সতর্ক, প্রার্থীরা সক্রিয়, ভোটাররা অপেক্ষায়। তবুও সমীকরণ স্পষ্ট নয়। ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভোট বিভাজন, দলীয় কোন্দল ও তরুণ ভোটারদের ভূমিকা—সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের নির্বাচন হতে যাচ্ছে অনিশ্চয়তার। ভোটের দিন শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং ফলাফলকে গ্রহণযোগ্য রাখা—এখন সেটিই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কারণ প্রস্তুত চট্টগ্রাম, কিন্তু ফলাফল নিয়ে শঙ্কা এখনো কাটেনি।
