মূল সংবাদে যান
অপরাধ

দেশজুড়ে আতঙ্ক: ভুয়া মামলা, মব সন্ত্রাস ও লাগামহীন চাঁদাবাজি

বিশেষ প্রতিবেদক : অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেশের মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। ভুয়া বা হয়রানিমূলক মামলা, পরিকল্পিত মব সন্ত্রাস, লাগামহীন চাঁদাবাজি

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
দেশজুড়ে আতঙ্ক: ভুয়া মামলা, মব সন্ত্রাস ও লাগামহীন চাঁদাবাজি

এবং রাজপথে একের পর এক আন্দোলন—সব মিলিয়ে জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছে নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের বিস্তার।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এই সময়কালে দেশে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৭৮৮টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে সহস্রাধিক মামলা সরাসরি ভুয়া বা হয়রানিমূলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। একই সময়ে সারা দেশে প্রায় ২৭০টি মব সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে।

ভুয়া মামলার প্রকোপ এতোটাই সীমা অতিক্রম করেছে যেখানে ব্যক্তিগত আক্রোশ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন, সম্পত্তি দখল এবং ওয়ারিশদের বঞ্চিত করা—এসব কারণে দায়ের হয়েছে সহস্রাধিক ভুয়া বা মিথ্যা মামলা।

আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেছেন, "আমাদের সরকারের আমলে সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক দুটি ঘটনা ঘটেছে—একটি হচ্ছে হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা এবং অন্যটি মব জাস্টিস। এই দুইটি আমাদের খুবই পীড়িত করে।"

ভুয়া মামলার অপব্যবহার রোধে ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ সংশোধন করে গত ১০ জুলাই গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। এতে তদন্ত চলাকালে অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা নিরপরাধ ব্যক্তিকে আগেভাগে অব্যাহতি দিতে সহায়ক হবে বলে আইন মন্ত্রণালয়ের দাবি।

‘মব সন্ত্রাস’ এখন নতুন আতঙ্কের নাম। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অধিকাংশ মব সন্ত্রাস পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়, যেখানে জনতার ক্ষোভকে উসকে দিয়ে মূল হোতারা দায় এড়িয়ে যায়।

সাম্প্রতিক উল্লেখযোগ্য ঘটনা: মুরাদনগর, কুমিল্লা: চুরির অভিযোগে মা-ছেলে-মেয়েকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা। গাজীপুর: যুবক হূদয়কে গণপিটুনি। ঢাকা: আল আমিন নামের তরুণকে হত্যাকাণ্ড। সিরাজগঞ্জ: এক মানসিক প্রতিবন্ধীকে হত্যা। গত ছয় দিনেই মব সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬ জন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, "গণপিটুনির মামলায় শাস্তির নজির নেই বললেই চলে। রাজনৈতিক দলগুলোর সংশ্লিষ্টতা থাকলে নির্মোহ শাস্তি দিতে হবে।"

লাগামহীন চাঁদাবাজি: চাঁদাবাজির কবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ। ব্যবসায়ী, শিক্ষক, প্রতিবন্ধী, মাছ চাষি—সবার কাছেই নিয়মিত চাঁদা দাবি করা হচ্ছে।

কিছু আলোচিত ঘটনা: ২৭ জুলাই, গুলশান: সমন্বয়ক পরিচয়ে চাঁদা নিতে এসে তরুণরা পুলিশের ফাঁদে ধরা। ৯ জুলাই, পুরান ঢাকা: ব্যবসায়ী মো. সোহাগ ওরফে লাল চাঁদকে প্রকাশ্যে হত্যা। ২৮ মে, মিরপুর: দম্পতি নাজমুল হাসান পাপ্পু ও দোলনাকে ছুরি মেরে হত্যা। ১৫ মে, বাড্ডা: বিএনপি নেতা কামরুল আহসান সাধনকে গুলি করে হত্যা। মানববন্ধন ও প্রতিবাদের ঢল নেমেছে ঝিনাইদহ, সাভার, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন স্থানে।

রাজপথে আন্দোলনের জোয়ার: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই ঢাকার রাজপথে আন্দোলন নিত্যদিনের চিত্র। এক বছরে ৩ শতাধিক আন্দোলন। এক দিনে সর্বোচ্চ ১৭ স্থানে অবরোধ। দাবি: চাকরি স্থায়ীকরণ, সরকারিকরণ, বদলি নিয়োগ, শিক্ষানীতি সংশোধন ইত্যাদি। এতে যানজট ও জনভোগান্তি বেড়েছে বহুগুণ। পুলিশের পক্ষেও আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান নিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, "সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। পুলিশ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সক্রিয়।"

তবে সমালোচকরা মনে করছেন, আইনের প্রয়োগে উদাহরণযোগ্য শাস্তি না দিলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে না।

এক বছরের পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ভুয়া মামলা, পরিকল্পিত মব সন্ত্রাস ও লাগামহীন চাঁদাবাজি দেশের আইনশৃঙ্খলার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনগত সংস্কার ও সক্রিয় পুলিশের পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে উদাহরণযোগ্য শাস্তিই এ পরিস্থিতি উত্তরণে জরুরি।

সম্পর্কিত বিষয়

  • দেশজুড়ে আতঙ্ক
  • আইনশৃঙ্খলা
  • সন্ত্রাস
  • আইন উপদেষ্টা
  • মব জাস্টিস

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন