মূল সংবাদে যান
অপরাধ

সাগর-রুনি হত্যায় সন্দেহে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ১৪ বছরেও তদন্তের কূলকিনারা হয়নি, মিলল ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও স্পর্শকাতর তথ্য

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পর নতুন তথ্য সামনে এনেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
সাগর-রুনি হত্যায় সন্দেহে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, ১৪ বছরেও তদন্তের কূলকিনারা হয়নি, মিলল ইলেকট্রনিক ডিভাইস ও স্পর্শকাতর তথ্য

অন্য একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পাওয়া একটি ক্লুর সূত্র ধরে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটররা।

একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সাগর-রুনির কাছে তৎকালীন সরকারের কিংবা বিডিআর হত্যাযজ্ঞ-সংক্রান্ত কোনো স্পর্শকাতর তথ্য বা ডকুমেন্টেশন থাকার বিষয়টিও সন্দেহ করা হচ্ছে।

ওই তথ্য কোনো ডিস্ক, টেপ, সার্ভার বা মেমোরি ডিভাইস-সংক্রান্ত হতে পারে বলে ধারণা করছেন প্রসিকিউশন। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের আগের রাতে র‌্যাবের তৎকালীন এক সাবেক মহাপরিচালকের ঘনিষ্ঠ একজনকে ‘পরদিন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা’ ঘটবে বলে সতর্ক করার তথ্যও জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এসেছে বলে দাবি করেছেন প্রসিকিউটর তানভীর জোহা।

নতুন এসব তথ্য সামনে আসার পর রোববার (৩০ আগস্ট) বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর তানভীর জোহার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন সাগর-রুনির একমাত্র সন্তান মাহির সরওয়ার মেঘ এবং মামলার বাদী রুনির ভাই নওশের আলী রোমান।

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় নির্মমভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। পরদিন ভোরে তাদের ক্ষত-বিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন হয়নি।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ‘কানেকশন’

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত তাদের সংস্থা সরাসরি করছে না; মামলাটি বর্তমানে পিবিআই তদন্ত করছে। তবে অন্য একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের একটি ক্লু পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, ওই ক্লুতে একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ‘কানেকশন’ পাওয়া গেছে। তবে তদন্তের স্বার্থে ওই ব্যক্তির নাম-পরিচয় এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না।

আমিনুল ইসলাম বলেন, পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে নজরদারিও রয়েছে। আরও তদন্তের পর তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা জানানো হবে।

র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তাকে ঘিরে তথ্য

প্রসিকিউটর তানভীর জোহা জানান, দুদকের একটি মামলায় র‌্যাবের সাবেক এক মহাপরিচালকের বরিশালের বাসা থেকে বিভিন্ন জিনিস জব্দ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ট্রাইব্যুনালও সেখানকার ইলেকট্রনিক ডিভাইস জব্দ করে। সেসব ডিভাইস বিশ্লেষণ করে ২০০৭ সাল থেকে পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন ডকুমেন্টেশন, সার্ভার এবং মুছে ফেলা কিছু ফাইল উদ্ধার করা হয়।

এসব তথ্য বিশ্লেষণের পর তিন-চারজন সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করা হয় বলে জানান তিনি। তাদের একজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং প্রথম জিজ্ঞাসাবাদেই ওই ব্যক্তি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন।

তানভীর জোহা বলেন, ওই ব্যক্তির বক্তব্য অনুযায়ী, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের আগের রাতে রাত ১০টা বা ১১টার দিকে তাকে বলা হয়েছিল—পরদিন একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটবে এবং ভোরে সেখানে উপস্থিত হয়ে রিপোর্ট করতে হবে। পরদিন সকালে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

ছিল কি স্পর্শকাতর কোনো তথ্য?

জিজ্ঞাসাবাদে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার দাবি করে প্রসিকিউটর জোহা বলেন, সাগর-রুনির কাছে বিডিআর হত্যাযজ্ঞ অথবা তৎকালীন সরকারের কোনো স্পর্শকাতর ডকুমেন্টেশন থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে। এসব তথ্য কোনো ডিস্ক, টেপ কিংবা মেমোরি ডিভাইসের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তির কাছ থেকে বেশ কিছু ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিখোঁজ থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে।

তবে প্রসিকিউশনের পাওয়া এসব তথ্য এখনো সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। পিবিআই বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে। প্রসিকিউশন জানিয়েছে, তথ্যগুলো আরও যাচাই ও এভিডেন্সের সঙ্গে কোলাবোরেট করার পর যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হতে পারে।

তিন সংস্থার তদন্ত, তবু রহস্য

সাগর-রুনি হত্যার পর প্রথমে শেরেবাংলা নগর থানার একজন কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেন। ২০১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তদন্তভার যায় গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তর বিভাগের পরিদর্শক মো. রবিউল আলমের কাছে। এর দুই মাস পর হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব পায় র‌্যাব।

পরবর্তীতে মামলার বাদীপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট তদন্তের জন্য টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন। বর্তমানে মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

দীর্ঘ ১৪ বছরেও হত্যাকাণ্ডের বিচারিক অগ্রগতি না হওয়ায় সাগর-রুনির পরিবার ও সাংবাদিক সমাজের মধ্যে হতাশা রয়েছে। নতুন ক্লু এবং স্পর্শকাতর তথ্যের ইঙ্গিত এবার সেই দীর্ঘ অমীমাংসিত হত্যারহস্য উন্মোচনে কতটা ভূমিকা রাখে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সম্পর্কিত বিষয়

  • সাগর-রুনি

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন