তবে বাজারের এই বাহ্যিক প্রাণচাঞ্চল্যের আড়ালে রয়েছে ব্যবসায়ীদের গভীর দুশ্চিন্তা| সরকারি হিসাবে প্রধান মসলার আমদানি প্রায় ২৫ শতাংশ কমলেও বাজারে সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই| উল্টো গত ১৫ দিনের ব্যবধানে প্রায় সব ধরনের গরম মসলার দাম কেজিতে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত কমেছে| ˆবধ আমদানিকারকদের অভিযোগ, সীমান্ত দিয়ে বিপুল পরিমাণ অবৈধ মসলা প্রবেশ করায় বাজারে এই ‘রহস্যময়’ দরপতন ঘটছে| এতে শুল্ক দিয়ে আমদানি করা ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন|
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে জিরা আমদানি হয়েছে ২ হাজার ৭৯৩ টন, লবঙ্গ ১ হাজার ২৫৭ টন, এলাচ ১ হাজার ৯৮ টন এবং জায়ফল ৩৪৬ টন| আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই চারটি প্রধান মসলার আমদানি কমেছে প্রায় এক-চতুর্থাংশ|
কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, অন্যান্য বন্দর দিয়েও মসলা আমদানি হচ্ছে| বাজারে সরবরাহে কোনো সংকট নেই|
চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কার্যালয়ের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহ আলম জানান, এলাচ ও জিরাসহ বিভিন্ন গরম মসলা স্থলবন্দর দিয়েও দেশে প্রবেশ করছে| তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ১০ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে এলাচ ১ হাজার ১৫০ টন, দারুচিনি ১৩ হাজার ২৯৬ টন, লবঙ্গ ১ হাজার ৩৫০ টন, জিরা ৩ হাজার ১১৫ টন, গোলমরিচ ১ হাজার ৯৫৯ টন, আদা ৪৫ হাজার ৫৩৮ টন এবং রসুন ৫৩ হাজার ১০১ টন আমদানি হয়েছে|
খাতুনগঞ্জের বিভিন্ন আড়ত ঘুরে দেখা গেছে, মে মাসের শুরুতে যে এলাচ পাইকারি পর্যায়ে কেজিপ্রতি ৪ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, তা এখন নেমে এসেছে ৩ হাজার ৯০০ টাকায়| একইভাবে লবঙ্গের দাম ৫০ টাকা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০০ টাকায়| জিরা বিক্রি হচ্ছে ৫৩০ টাকায় এবং গোলমরিচ ১ হাজার ১০ টাকায়|
গরম মসলা ব্যবসায়ী মো. বাদশা বলেন, “ডিউটি দিয়ে জিরা আমদানি করতে কেজিতে খরচ পড়ে প্রায় ৫৩০ টাকা| অথচ কিছু ব্যবসায়ী সেই জিরা ৫০০ টাকায় বিক্রি করছে| এলাচেও একই অবস্থা| ˆবধ পথে আমদানি করলে প্রতি কেজি এলাচের দাম পড়ে ৪১০০ থেকে ৪২০০ টাকা| কিন্তু বাজারে তা ৪ হাজার টাকার কাছাকাছি বিক্রি হচ্ছে| এতে নিয়মিত আমদানিকারকরা মার খাচ্ছেন|”
বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি অমর কান্তি দাশ বলেন, “আমরা ব্যাংকে এলসি খুলে, ডলার প্রিমিয়াম দিয়ে ও শুল্ক-কর পরিশোধ করে পণ্য আমদানি করি| অথচ চোরাই পথে আসা মসলা অনেক কম দামে বিক্রি হচ্ছে| এতে ˆবধ ব্যবসায়ীরা টিকতে পারছেন না| বর্তমানে ছোট এলাচ ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৯০০ টাকা, বড় এলাচ ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৪০০ টাকা, লবঙ্গ ১ হাজার ২৬০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা এবং চিকন জিরা ৫২৫ থেকে ৫৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে|
আমদানিকারক ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাকের দাবি, সিলেট, কুমিল্লা ও ফেনী সীমান্ত দিয়ে জিরা, এলাচ, কিশমিশ ও কাজুসহ বিভিন্ন মসলা অবৈধভাবে দেশে ঢুকছে| এতে সরকার বিপুল রাজ¯^ হারাচ্ছে| তাঁর ভাষ্য, জিরায় কেজিপ্রতি ২২০ থেকে ২৫০ টাকা এবং এলাচে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত শুল্ক হারাচ্ছে সরকার| অন্যদিকে বাজারে ভিন্ন চিত্রও দেখা যাচ্ছে| অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার মৌসুমি পাইকার ও জেলা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি কম| ফলে ঈদের মৌসুমেও প্রত্যাশিত বিক্রি পাচ্ছেন না আড়তদাররা|
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী জুলফিকার আলী বলেন, “এই বছরের মতো মন্দা আগে দেখিনি| ঈদের সময়েও বিক্রি কম| খরচ বাড়ছে, কিন্তু ক্রেতা নেই| প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে|”
মেসার্স হাজী জসিম ট্রেডার্সের ম্যানেজার আশিকুর রহমান জিহান বলেন, “সাধারণত ঈদের আগে মসলার চাহিদা বাড়লে দামও বাড়ে| কিন্তু এবার উল্টো চিত্র| বাজারে পর্যাপ্ত পণ্য মজুত থাকলেও ক্রেতা কম| ফলে দামও নিম্নমুখী|”
এদিকে খুচরা বাজারে এখনো কিছু মসলার দাম তুলনামূলক বেশি| বকশির হাটে ভারতীয় এলাচ বিক্রি হচ্ছে কেজিতে ৪ হাজার ৮০০ টাকা, শ্রীলঙ্কান দারুচিনি ১ হাজার ৫০ টাকা এবং চিকন জিরা ৬২০ টাকায়| সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে শুকনা মরিচের বাজার| ব্যবসায়ীরা জানান, দুই-তিন মাস আগে ভারতীয় শুকনা মরিচ ৩৬০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা বেড়ে ৪২৫ টাকায় উঠেছে| হাটহাজারীর স্থানীয় মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায়|
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, বড় পরিবার ভেঙে ছোট পরিবারে রূপান্তর এবং প্যাকেটজাত মসলার ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে পাইকারি বাজারে আগের মতো চাপ নেই| পাশাপাশি চোরাচালান ও বাজার তদারকির ঘাটতি ˆবধ ব্যবসাকে আরও সংকটে ফেলছে|
খাতুনগঞ্জের মেসার্স ইসহাক ট্রেডার্সের ¯^ত্বাধিকারী সেকান্দার হোসেন বলেন, “ঈদের আগে বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে সীমান্ত চোরাচালান বন্ধ, ˆবধ আমদানিতে সহায়তা এবং পাইকারি বাজারে নিয়মিত নজরদারি বাড়ানোর বিকল্প নেই|”
