মূল সংবাদে যান
অপরাধ

জঙ্গল সলিমপুর: সন্ত্রাসের আস্তানা থেকে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে

জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশপথে থাকত সশস্ত্র পাহারা। তিন সহ্স্রাধিক একর পরিমান বিশাল এলাকায় ঢুকতে হলে দেখাতে হতো ‘বিশেষ পরিচয়পত্র’। এমনকি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও অনেক সময় ভেতরে প্রবেশ করতে পারতেন না।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
জঙ্গল সলিমপুর: সন্ত্রাসের আস্তানা থেকে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে

অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার মুখে ফিরে আসার ঘটনা ছিল নিয়মিত। আর সেই ‘ভয়ংকর’ জঙ্গল সলিমপুর এখন প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে।

গত ২ মার্চ সোমবার সেনাবাহিনী, র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবির যৌথ অভিযানের পর চট্টগ্রামের এই বিতর্কিত এলাকার দৃশ্যপট বদলে গেছে। প্রথমবারের মতো বড় ধরনের একটি অভিযান রক্তপাত ছাড়াই শেষ হয়েছে। চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা আগেই এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। অভিযানের পর পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় যৌথ বাহিনী।

re.jpg

সরেজ্মিনে শুক্রবার (১৪ মার্চ) জঙ্গল সলিমপুর ঘুরে দেখা গেছে, ভেতরে স্থাপন করা হয়েছে পুলিশের দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প। নিয়মিত টহল চলছে। সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্য আনাগোনা নেই। সাধারণ মানুষও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করছেন।

জানা যায়, পাহাড় কেটে বসতি গড়া, সরকারি খাসজমি দখল, কোটি কোটি টাকার প্লট–বাণিজ্য, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা দখলদার গোষ্ঠী এবং দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা সরকারি প্রকল্পের এসবের মূল কারণ। প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর এলাকায় কয়েক দশক ধরে দখলদারদের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও সাম্প্রতিক অভিযানের পর সেখানে প্রথমবারের মতো দৃশ্যমানভাবে প্রশাসনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছে।

নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক ধরে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের বিপরীত দিকের পাহাড়ি সড়ক দিয়ে প্রবেশ করলেই জঙ্গল সলিমপুর। পাহাড় কেটে তৈরি সরু ও প্রশস্ত পথ ধরে লোকজন অবাধে চলাচল করছেন। দোকানপাট খোলা। বাজারে মানুষের ভিড়। কোথাও শিশুরা খেলছে, আবার কোথাও পুলিশের টহল চোখে পড়ে।

প্রশস্ত সড়ক ধরে কিছু দূর এগোলে ডান পাশে একটি মাজার। এরপর এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়। বিদ্যালয়সংলগ্ন বাজারে মাছ, মাংস, শাকসবজি ও নিত্যপণ্যের দোকানে ক্রেতাদের ভিড় দেখা যায়। দীর্ঘদিনের ভয়ের পরিবেশ কাটিয়ে মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইছেন।

জঙ্গল সলিমপুরের সংকটের মূলে রয়েছে পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা প্লট–বাণিজ্য। অন্তত ৩০টি পাহাড় ধাপে ধাপে কেটে সমতল করা হয়েছে। এরপর ছোট ছোট প্লটে ভাগ করে বসতি তৈরির জন্য বিক্রি করা হয়। শহরের কাছাকাছি তুলনামূলক কম দামে জমি পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে এই বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়।

পুলিশ ও জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, আলীনগর এলাকায় আড়াই কাঠা আকারের একটি প্লট প্রায় ৩০ লাখ টাকায় বিক্রি হতো। এর বাইরে ছোট আকারের প্লট পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রি করা হতো। ছোট প্লটের সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার, যার মধ্যে অন্তত ২৩ হাজার ইতোমধ্যে বিক্রি হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। সব মিলিয়ে গত চার দশকে এখানে হাজার কোটি টাকার প্লট–বাণিজ্য হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে স্থানীয়রা বলেন, “আগের চেয়ে ভালো আছি। এভাবে থাকতে পারলেই হয়। আগে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে মারামারি হতো, বাইরে থেকে অস্ত্রধারীরা আসত। রাতের পর রাত অনিশ্চয়তায় কাটাতে হতো। এখন অন্তত সেই ভয়টা কমেছে। এখানে বহুবার আধিপত্যের পালাবদল হয়েছে। গোষ্ঠী বদলেছে। এখন যে শান্তি এসেছে, সেটি যেন স্থায়ী হয়—এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।

স্থানীয়দের দাবি, আলীনগর এলাকায় মূলত ‘আলীনগর বহুমুখী সমিতি’র মাধ্যমে ইয়াসিনের লোকজন প্লট বিক্রি করতেন। অন্যদিকে জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল অংশে প্লট বিক্রি হতো ‘মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ’-এর মাধ্যমে।

বর্তমানে এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ে পুলিশের একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ১৩০ জন পুলিশ সদস্য অবস্থান করছেন। আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়েও আরেকটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ২৩০ জন র‌্যাব, পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য রয়েছেন।

টহলরত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী বলেন, “এখন দৃশ্যমান কোনো সন্ত্রাসী নেই। স্থানীয় লোকজনও পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন। স্বস্তি বজায় রাখতে নিয়মিত টহল থাকবে।”

জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান মানেই হামলা—এমন ধারণা বহুদিনের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঢুকলেই পাহারায় থাকা লোকজন খবর দিয়ে দিত। এরপর পাহাড়ের ওপর থেকে ইটপাটকেল, ককটেল, কখনো গুলিও ছোড়া হতো। সর্বশেষ গত ১৯ জানুয়ারি অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হন র‍্যাব-৭–এর উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। এর আগেও কয়েকবার অভিযান চালাতে গিয়ে হামলার মুখে পড়েছে প্রশাসন।

তবে ২ মার্চের অভিযান ছিল ভিন্ন। প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্যের যৌথ বাহিনী পরিকল্পিতভাবে অভিযান চালায়। আগের রাতে আলীনগরের প্রবেশমুখে ট্রাক রেখে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছিল এবং একটি কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়েছিল। কিন্তু বাহিনীর সদস্যরা ইট-বালু ফেলে কালভার্ট সচল করেন, ব্যারিকেড সরান এবং ভোর পাঁচটা থেকে বেলা দুইটা পর্যন্ত টানা নয় ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেন।

অভিযানে বিভিন্ন স্থান থেকে ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। অভিযানে ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী এখনো পলাতক।

চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক আহসান হাবীব পলাশ বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল এই বিশাল এলাকায় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। আমরা সেটি করতে পেরেছি। এখন পুলিশ ও র‌্যাবের দুটি ক্যাম্প কাজ করছে।”

উল্লেখ্য, ২০২২ সালে এলাকাটিকে ১১টি ভাগে বিভক্ত করে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার-২, মডেল মসজিদ, নভোথিয়েটার ও আইটি পার্কসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু দখলমুক্ত করতে না পারায় সেগুলো থমকে ছিল। ধারণক্ষমতার তিন গুণের বেশি বন্দী থাকায় নতুন কারাগার তৈরির জন্য এখানে ৫০ একর জমি নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু জমি বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, একটি মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে ধাপে ধাপে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। পরিবেশ ও বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • জঙ্গল সলিমপুর

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন