শুক্রবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স ২০২৫-এ দেওয়া তাঁর বক্তব্য এই দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকটের জটিলতা ও আঞ্চলিক প্রভাব নতুন করে সামনে এনেছে।
রোহিঙ্গা সংকটের কোনও তাৎক্ষণিক সমাধান দেখা যাচ্ছে না। প্রত্যাবাসন কার্যত অচল, আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকার অন্যদিকে সরে গেছে, আর শিবিরে জন্ম নেওয়া নতুন প্রজন্ম ভবিষ্যতের বড় অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশের সামনে তাই কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণভাবে নিরাপত্তা, শিক্ষা ও উন্নয়নকেন্দ্রিক দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণই প্রধান করণীয় হয়ে উঠছে।
শিবিরে নতুন প্রজন্ম, নতুন হুমকি -
রোহিঙ্গা শিবিরে শিশু ও তরুণদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। এ প্রজন্ম শিবিরজীবন মেনে নিতে অনিচ্ছুক। বিশ্লেষকদের মতে, যদি তারা সংগঠিত হয়ে বিদ্যমান কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করে, তাহলে কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাই নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ রয়েছে—সংকট দীর্ঘায়িত হলে এই তরুণরা সন্ত্রাসী সংগঠন বা অপরাধচক্রের টার্গেটে পরিণত হতে পারে।
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কেন আটকে আছে -
ড. তৌহিদ হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের সামরিক সরকারের মূল লক্ষ্যই হলো দেশটিকে “রোহিঙ্গা শূন্য” করা। সে কারণে বাস্তবে প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। গত কয়েক বছরে চীন ও আসিয়ানের মধ্যস্থতায় প্রত্যাবাসন নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা হলেও তা কার্যকর হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা, জান্তার নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং আন্তর্জাতিক চাপের অভাব প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে কার্যত অচল করে রেখেছে।
আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির প্রভাব -
বৈশ্বিক অস্থিরতা রোহিঙ্গা ইস্যুকেও আড়ালে ফেলে দিয়েছে। গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার মতো ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ সরিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকলেও বড় শক্তিগুলোর অগ্রাধিকার তালিকায় রোহিঙ্গা সংকট অনেকটা নিচের সারিতে চলে গেছে।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের পরিবর্তনও এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ। একসময় কোয়াডের মাধ্যমে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও সাম্প্রতিক সময়ে চীনের সঙ্গে অনেক বিষয়ে তাদের অবস্থান কাছাকাছি এসেছে। ভূরাজনীতির এ পুনর্বিন্যাস দক্ষিণ এশিয়ার শক্তি ভারসাম্যে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে বাংলাদেশের কণ্ঠ তুলনামূলক দুর্বল হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা -
বাংলাদেশে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রিত রয়েছে, যাদের দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময় যত গড়াচ্ছে, এ সংকটকে শুধু মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখা যাবে না, বরং জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবেও দেখা হতে পারে।
তবে ড. তৌহিদ হোসেন আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তরুণ নেতৃত্ব যেভাবে ফ্যাসিবাদকে হটিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছে, তাতে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ইতিবাচক। তাঁর মতে, আগামী এক যুগে বাংলাদেশ যদি জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে পারে, তবে সংকট মোকাবিলার শক্ত ভিত্তি গড়ে উঠতে পারে।
