মূল সংবাদে যান
অপরাধ

চট্টগ্রামের পুকুর দখলে পরিবেশ হুমকিতে, প্রশাসন নীরব

চট্টগ্রাম শহর, একসময় যেখানে অসংখ্য পুকুর, খাল ও জলাধার ছিল নগরবাসীর প্রাকৃতিক নিঃশ্বাস ফেলার অবলম্বন—সেই শহরই আজ পরিণত হচ্ছে কংক্রিটের কফিনে।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
চট্টগ্রামের পুকুর দখলে পরিবেশ হুমকিতে, প্রশাসন নীরব

সাম্প্রতিক এক মানববন্ধনে পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, চট্টগ্রাম শহরের অর্ধেকের বেশি পুকুর এখন প্রভাবশালী দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে। সরকারি তথ্যে থাকা ৪ হাজার ৬৪১টি পুকুরের মধ্যে ২ হাজার ৩৯০টিরই আর নাগরিক অধিকার নেই—এগুলো এখন ভূমিদস্যুদের পেটের ভেতরে।

চট্টগ্রাম আজ এক দ্বিধার মুখে—একদিকে উন্নয়নের দোহাই, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের টিকে থাকার প্রশ্ন। পুকুরের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করে উন্নয়ন নয়, বরং এদের সংরক্ষণ করেই টেকসই নগরায়ণ সম্ভব। পুকুর হারিয়ে গেলে হারাবে জীবন, হারাবে শহরের প্রাণ।

huanhain.png

সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন (বাপসা) এবং চট্টগ্রাম ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ)-এর যৌথ মানববন্ধনে উত্থাপিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগরীর ৪ হাজার ৬৪১টি পুকুরের মধ্যে অন্তত ২ হাজার ৩৯০টি এখন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দখলে। এর মধ্যে মোহরার শতবর্ষী পুকুরও রয়েছে, যা স্থানীয় জনগণের ব্যবহারের জন্য ছিল।

দখলের নেপথ্যে কারা?

পরিবেশকর্মীরা অভিযোগ করছেন, এই পুকুর দখল ও ভরাটের সঙ্গে যুক্ত আছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, ভূমিদস্যু এবং প্রশাসনের কিছু দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা। রাতে ট্রাকে করে বালু এনে পুকুরে ঢেলে দেওয়া হচ্ছে। দিনের আলোয় 'আবাসন প্রকল্প' বা 'ডেভেলপমেন্ট পারমিশন' দেখিয়ে এসব কর্মকাণ্ডকে বৈধতার রূপ দেওয়া হয়।

নগরীর মোহরা এলাকার শতবর্ষী পুকুরটির কথা বলছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, একসময় স্থানীয় জনগণের ব্যবহার্য এই জলাধারটি এখন চোখের সামনে রাতদিন ভরাট হচ্ছে—প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে নয়, বরং প্রশাসনের চোখের সামনেই। কেউ দেখছে না, কেউ দেখার ভানও করছে না।

সাম্প্রতিক হারিয়ে যাওয়া ৫টি দখল হওয়া পুকুরের তথ্য

১। দামুয়া পুকুর, ওয়ার্ড নম্বর ২৮, কোতোয়ালী। যার বর্তমান অবস্থা জলাভাবিক রূপ নেই, জায়গা প্লট বা ভবন লিজ করা স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বা ভূমিদস্যুর নামে। ২। কাজীর দীঘি, কাজীর দেউড়ী, কোতোয়ালী। যার বর্তমান অবস্থা সমতলে রূপান্তর, সামান্য জলাবশিষ্ট, প্রভাবশালী স্থানীয় নেতা বা প্রকল্পমালিকের নামে। ৩। ফতেয়াবাদ দীঘি, ফতেয়াবাদ, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম, যার বর্তমান অবস্থা স্যাটেলাইটে দেখা যায় জলাভূমি ধীরে ক্ষয় হচ্ছে, সরকারি ভূমিতে দখল আছে। ৪। অলিমা দীঘি, পুরনগর, আশেপাশে নির্মাণের ছায়া, যার বর্তমান অবস্থা কম পানি, ভবন নির্মাণ কর্তৃপক্ষ নামে। ৫। বহদ্দার বাড়ি পুকুর, বহদ্দার হাট, চান্দগাঁও, চট্টগ্রাম। যার বর্তমান অবস্থা সম্পূর্ণ ভরাটকৃত, প্লট নির্মাণ, আবাসন প্রকল্প মালিক বা রাজনৈতিক সিন্ডিকেট এর নামে।

এ বিষয়ে বাপসার কেন্দ্রীয় সভাপতি এম এ হাশেম রাজু বলেন, “প্রশাসন ও মাফিয়া লুটেরা গোষ্ঠীর ছত্রচ্ছায়ায় প্রতিনিয়ত পুকুর ভরাট চলছে। এভাবে চলতে থাকলে নগরের জলাধার বলতে কিছুই থাকবে না।”

আইন আছে, প্রয়োগ নেই:

বাংলাদেশের নদী ও খাল রক্ষা আইন ২০০০ এবং পানি সংরক্ষণ আইন ২০১৩ অনুসারে যেকোনো প্রাকৃতিক জলাধার ভরাট দণ্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু বাস্তবে চট্টগ্রামে এসব আইন কার্যত অপ্রয়োজনে পরিণত হয়েছে। পুকুরের জায়গা দলিল থেকে মুছে ফেলা, খাস জমি দেখিয়ে বরাদ্দ নেওয়া বা আদালতের স্থগিতাদেশ উপেক্ষা করা—এসবই এখন রীতিমতো দখলদারদের 'নিয়মিত' কৌশল।

পরিবেশবিদদের মতে, পুকুর ধ্বংসের পরিণতি মানে পরিবেশের বিপর্যয়। শুধু দৃশ্যমান জলাবদ্ধতা বা তাপমাত্রা বৃদ্ধি নয়, এর পরিণতি আরও গভীরে। তাছাড়া ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। শহরের প্রাকৃতিক শীতলীকরণ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে। পাখি ও জলজপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। বৃষ্টির পানি জমে নাগরিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে (ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া)। শিশু ও গর্ভের সন্তান পর্যন্ত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

মানবাধিকারকর্মী খোরশেদ আলমদারের মতে, “পুকুর ভরাটের কারণে আজ মায়ের গর্ভেই শিশুর শরীরে ক্যান্সারের উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। এটা শুধু পরিবেশ নয়, মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।”

প্রশাসনের ভূমিকা: গাফিলতি না সহায়তা?

এই প্রশ্নটি এখন সময়ের দাবি। কেন নগর প্রশাসন এতোগুলো প্রকাশ্য দখলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না? অনেক সময় অভিযোগ পাওয়া যায়, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের কিছু সদস্য ঘুষের বিনিময়ে এসব কাজ দেখেও না দেখার ভান করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবি) ও পরিবেশ অধিদপ্তর—এই চার সংস্থার সমন্বয়হীনতা এবং রাজনৈতিক চাপ প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপকে বাধাগ্রস্ত করছে।

পরিবেশবিদরা পাঁচটি মূল পদক্ষেপের মাধ্যমে সমাধানের কথা বলছেন:

পুকুর ও জলাশয়ের ডিজিটাল মানচিত্র প্রকাশ করা (উন্মুক্ত ওয়েবপোর্টালসহ)। দখলদারদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক উচ্ছেদ অভিযান এবং আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। নগর পরিকল্পনায় বাধ্যতামূলকভাবে জলাধার সংরক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করা। সচেতনতা বৃদ্ধিতে নাগরিক অংশগ্রহণ ও স্থানীয় আন্দোলন জোরদার করা ও পরিবেশ আদালতের কার্যকারিতা পুনর্বিন্যাস ও তদারকি জোরদার করা।

পরিবেশ আইন বিশেষজ্ঞ ডা তৌকির হোসেন বলেন, “নদী ও খাল রক্ষা আইন ২০০০ এবং পানি সংরক্ষণ আইন ২০১৩ অনুসারে কোনো প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট করা স্পষ্ট দণ্ডনীয় অপরাধ। বাস্তবে প্রশাসন হস্তক্ষেপ না করলে, এ ধরনের কার্যক্রম অবৈধ হলেও উপেক্ষিত থাকে। তথ্যের ভিত্তিতে ডাটা‑বেস তৈরী ও জলাধার হটলিস্টিং করলে আইন প্রয়োগে অনেকটা সুবিধা আসবে। প্রশাসনের উদাসীনতা দূর করার জন্য সময় মতো মামলার নিষ্পত্তি ও অভিযানের কার্যকারিতা বাড়ানো জরুরী।

সম্পর্কিত বিষয়

  • পুকুর
  • বাপসা
  • সিডিএফ
  • শতবর্ষী পুকুর

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন