পুলিশের জরিপ বলছে, নগরে সক্রিয় রয়েছে প্রায় ২০০টি কিশোর গ্যাং। এসব গ্রুপের সদস্য প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন। ছয় বছরে কিশোর গ্যাংয়ের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া ৫৪৮টি অপরাধের মধ্যে ৪০টিই খুন।
অপরাধের সামনের সারিতে কিশোরদের দেখা গেলেও তাদের পেছনে থাকা ‘বড় ভাই’দের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। পুলিশের ওই জরিপে কিশোর গ্যাংকে পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে পাঁচজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ ৬৪ জনের তালিকা থাকার কথা জানা যায়। ফলে কেবল কিশোরদের আটক করে অভিভাবকের জিম্মায় দেওয়া কতটা কার্যকর—তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যেই নগর ও জেলায় অপরাধ দমনে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ।
গত রবিবার সন্ধ্যা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলার ১৭ থানায় একযোগে বিশেষ অভিযান চালায় জেলা পুলিশ। পাড়া-মহল্লা, বাজার, রেলস্টেশন, মাঠ, পরিত্যক্ত ভবন ও নির্জন স্থানে কিশোরদের সম্ভাব্য আড্ডাস্থলে চলে তল্লাশি। অভিযানে ৩৫৪ কিশোরকে থানায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ ও যাচাই-বাছাই করা হয়।
অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ না পাওয়ায় ২৯৩ জনকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় দেওয়া হয়। অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় ৬১ জনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মাদক ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগে আরও ৯১ জনকে আটক করা হয়। সব মিলিয়ে অভিযানে আটক হন ৪৪৫ জন।
জেলা পুলিশ বলছে, এ অভিযান কেবল ধরপাকড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পরিবেশ ও আড্ডাস্থল শনাক্ত করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য। পুলিশের ২০২৪ সালের জরিপে নগরে প্রায় ২০০টি কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্বের তথ্য উঠে আসে। সদস্যসংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪০০।
এসব গ্যাংয়ের প্রভাব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও রয়েছে বলে জরিপে উঠে আসে। জরিপ অনুযায়ী, নবম ও দশম শ্রেণির কিছু শিক্ষার্থী ক্লাস ফাঁকি দিয়ে অভিভাবকদের অগোচরে বয়সে বড়দের প্ররোচনায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। শুরুতে ‘হিরোইজম’ বা এলাকায় প্রভাব দেখানোর আকাঙ্ক্ষা থেকে তারা অপরাধে জড়ালেও পরে সেই চক্র থেকে বের হয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।
কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতার ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়েছে গত কয়েক বছরের একাধিক ঘটনায়। ২০২৪ সালের ৫ এপ্রিল ছেলেকে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের হাত থেকে রক্ষা করতে গিয়ে হামলার শিকার হন দন্তচিকিৎসক কুরবান আলী। পাঁচ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ১০ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়। ১৩ এপ্রিল নগরের চকবাজারে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় নিহত হন এইচএসসি পরীক্ষার্থী আশফাক কবির সাজিদ। একই বছরের ৩ জুন আগ্রাবাদের চারিয়াপাড়ায় পাড়াভিত্তিক বিরোধে ছুরিকাঘাতে নিহত হন ১৭ বছর বয়সী নুরুল আজিম।
ইপিজেড এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে প্রাণ হারান কারখানাশ্রমিক মেহেদী হাসান। ৮ জুন পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে মোটরসাইকেলের শব্দ নিয়ে বিরোধের জেরে ছুরিকাঘাতে নিহত হন তরুণ মনিরুজ্জামান রাফি। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের মে মাসে হালিশহরে কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষের বিরোধে ছুরিকাঘাতে আহত কলেজছাত্র ওয়াহিদুল হক ওরফে সাব্বিরের মৃত্যু হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়।
সাম্প্রতিক অভিযানে শত শত কিশোরকে থানায় এনে যাচাই-বাছাই করা হলেও কিশোরদের অপরাধে ব্যবহারের পেছনে থাকা প্রাপ্তবয়স্কদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। পুলিশের তথ্যেই কিশোর গ্যাংকে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগে ৬৪ জন ‘বড় ভাইয়ের’ তালিকার কথা রয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় মাদক, অস্ত্র, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সংঘর্ষে কিশোরদের ব্যবহারের অভিযোগও সামনে এসেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শহীদুল ইসলাম ওরফে বুইস্যা চুরি ও ছিনতাইয়ের মাধ্যমে অপরাধজগতে প্রবেশ করেন। পরে মাদক কারবারে জড়িয়ে নিজের বাহিনী গড়ে তোলেন। তাঁর বিরুদ্ধে অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এ ধরনের অপরাধচক্রের সঙ্গে কিশোরদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা না গেলে কেবল অভিযান চালিয়ে কিশোর অপরাধের বিস্তার ঠেকানো কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানান, নগরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে চুরি, ছিনতাই, মাদক, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। গতকাল বুধবার দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে সিএমপির সেপ্টেম্বর মাসের মাসিক কল্যাণ সভায় তিনি পুলিশ সদস্যদের সততা, নিষ্ঠা, কর্তব্যপরায়ণতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন। অপরাধ দমনে আরও সক্রিয় হওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
জেলা পুলিশ বলছে, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে শুধু পুলিশের অভিযান যথেষ্ট নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান—সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। অভিভাবকদের সন্তান কখন, কোথায় এবং কার সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে, নির্ধারিত সময়ে বাড়ি ফিরছে কি না—এসব বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে পড়াশোনা, বন্ধুবান্ধব, চলাফেরা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর নজরদারির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জেলা পরিষদের প্রশাসক মাহবুবার রহমান শামীমও শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলা, বিতর্ক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসব কার্যক্রম বাড়ানো গেলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখা এবং অপরাধপ্রবণতা থেকে দূরে রাখার সুযোগ বাড়বে।
চট্টগ্রামে কিশোর অপরাধের বিরুদ্ধে একযোগে অভিযান, শত শত কিশোরকে আটক, যাচাই-বাছাই এবং অভিভাবকের জিম্মায় দেওয়া—এসব পদক্ষেপে তাৎক্ষণিক বার্তা গেলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে।
কারণ পুলিশের জরিপে যখন প্রায় ২০০টি গ্যাং, ১ হাজার ৪০০ সদস্য, ৫৪৮টি অপরাধ এবং ৪০টি খুনের তথ্য উঠে আসে, তখন শুধু কিশোরদের আটক করে ছেড়ে দেওয়া নয়—কিশোরদের অপরাধে টেনে নেওয়া নেটওয়ার্ক, পৃষ্ঠপোষক এবং অপরাধের অর্থনৈতিক উৎস চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়াই হয়ে উঠছে বড় চ্যালেঞ্জ। চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক অভিযান সেই চ্যালেঞ্জেরই নতুন করে সামনে এনেছে।