মূল সংবাদে যান
অপরাধ

তেলের দামে আগুন, চট্টগ্রামে গণপরিবহনে ভাড়ার ‘নৈরাজ্য’ যাত্রী-শ্রমিক মুখোমুখি

এক রাতের ব্যবধানে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে সর্বোচ্চ ২০ টাকা বাড়ানোর প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম নগরের গণপরিবহনে। সরকারের নতুন দর কার্যকরের প্রথম দিন সোমবার সকাল থেকেই বিভিন্ন রুটের বাস, মিনিবাস ও হিউম্যান হলারে আগের নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ৫ টাকা বেশি আদায় করা হচ্ছে।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

কোথাও বাড়তি ভাড়া দিতে রাজি না হওয়ায় যাত্রীদের সঙ্গে চালক-হেলপারের বাগ্বিতণ্ডা হয়েছে।

নগরের বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট, জিইসি, ওয়াসা, আগ্রাবাদ, দেওয়ানহাট, চকবাজার, নিউমার্কেট ও অলংকার মোড় এলাকায় সরেজমিনে বাড়তি ভাড়া আদায়ের এমন চিত্র দেখা গেছে। পরিবহন শ্রমিকদের যুক্তি—জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় গাড়ি চালানোর খরচ বেড়েছে।

অন্যদিকে যাত্রীদের প্রশ্ন, সরকারি অনুমোদন ছাড়া হঠাৎ করে বাড়তি ভাড়া আদায়ের সুযোগ কোথায়? ফলে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রথম দিনেই নগরের সড়কে তৈরি হয়েছে নতুন এক চাপ—একদিকে বাড়তি পরিচালন ব্যয়ের বোঝা, অন্যদিকে আয় না বাড়ায় যাত্রীদের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ।

সোমবার সকাল থেকে বিভিন্ন রুটে আগের ভাড়ার সঙ্গে ৫ টাকা যোগ করে আদায় করতে দেখা গেছে। মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট ও আগ্রাবাদ এলাকায় যাত্রীদের সঙ্গে চালক ও সহকারীদের একাধিকবার তর্কে জড়াতে দেখা যায়।

মুরাদপুরে গণপরিবহনে চলাচলকারী সাকিল বলেন, ‘এটা সবার জন্যই প্রেশার হয়ে যাচ্ছে। হুট করে তেলের দাম বাড়া আমাদের জন্য ভোগান্তি ছাড়া আর কিছুই না। সরকার সবকিছুর দাম বাড়াচ্ছে। আমাদের আয় তো বাড়ছে না।’ দুই নম্বর গেটের নিয়মিত মহিলা যাত্রীর ভাষ্য, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শুধু পরিবহন ব্যয় নয়, শিল্প, কৃষি ও অন্যান্য খাতেও এর প্রভাব পড়ে।

তাঁর মতে, একবারে এতটা মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। আগ্রাবাদের যাত্রী আনোয়ার বলেন, ‘আমি চাই আয় অনুযায়ী ব্যয় ঠিক রাখতে। এখন সরকারই যদি আমাদের ব্যয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করে, তাহলে আমাদের বিকল্প চিন্তা করতে হবে।’

পরিবহন শ্রমিকদের দাবি, আগের মূল্যবৃদ্ধির সময় তাঁরা ভাড়া বাড়াননি। এবার ডিজেলের দামসহ অন্যান্য জ্বালানির দাম এক লাফে অনেকটা বেড়ে যাওয়ায় সেই চাপ আর সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। একে খান মোড়ের হিউম্যান হলার চালক মাকসুদ বলেন, ‘এর আগেও একবার তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। আমরা তখন ভাড়া বাড়াইনি। এখন আবার এক লাফে ২০ টাকা বেড়েছে। তাই ৫ টাকা করে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। অনেক যাত্রী বিষয়টি বুঝছেন। আবার অনেকে গালাগাল করছেন। কিন্তু কী করব, পেটের দায়ে সব করতে হচ্ছে।’

দেওয়ানহাট মোড়ের এক বাস সহকারী সোহেল বলেন, ‘আমরা বাড়তি টাকায় তেল কিনছি। এই তেল পুড়িয়ে বাসে চড়ে আপনি বাড়তি ভাড়া দেবেন না—এটা কীভাবে হয়?’ তবে পরিবহন শ্রমিকদের দাবির সঙ্গে যাত্রীদের সম্মতি না থাকায় ভাড়া নিয়ে সড়কে নতুন করে বিরোধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর গণপরিবহনের ভাড়া সমন্বয়ের বিষয়টি নিয়ে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হলেও সোমবার সকালেই অনেক রুটে বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু হয়েছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন পূর্বাঞ্চল (চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ) কমিটির সভাপতি মৃণাল চৌধুরী বলেন, ‘কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়া হঠাৎ করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো মানে যাত্রী ও পরিবহন শ্রমিকদের মুখোমুখি অবস্থানে ফেলা। যাত্রীরা হঠাৎ বাড়তি ভাড়া দিতে রাজি হবেন না। আর পরিবহন শ্রমিকরা অপারগ হয়ে বাড়তি দামে তেল কিনছেন। তিনি জানান, বাড়তি ব্যয় কীভাবে সমন্বয় করা যায়, তা নিয়ে সোমবার সন্ধ্যায় বৈঠক করার কথা রয়েছে। বৈঠকের সিদ্ধান্তের পর পরবর্তী পদক্ষেপ জানানো হবে।

সরকার রোববার রাতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে নতুন মূল্য নির্ধারণ করে। সোমবার থেকে নতুন দর কার্যকর হয়েছে। এতে জ্বালানি ডিজেল আগের ১১৫ টাকা হলেও এখন ১৩৫ টাকার কারণে ২০ টাকা বৃদ্ধি হয়েছে, কেরোসিন আগের ১৩৫ টাকা থেকে বর্তমান ১৫৫ টাকা হওয়ার কারণে ২০ টাকা বৃদ্ধি হয়েছে, অকটেন আগের ১৪৫ টাকা থেকে বর্তমানে ১৬৫ টাকা হওয়ার কারণে ২০ টাকা বৃদ্ধি হয়েছে এবং পেট্রোল আগের ১৪০ টাকা থেকে বেড়ে ১৬০ টাকা হওয়ার কারণে ২০ টাকা হয়েছে। ফলে মার্চের তুলনায় ডিজেলের দাম বেড়েছে লিটারে ৩৫ টাকা, অকটেন ৪৫ টাকা, পেট্রোল ৪৪ টাকা এবং কেরোসিন ৪৩ টাকা।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধের কারণে মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্বিগুণের বেশি বাড়লেও বাংলাদেশে সেই হারে মূল্য সমন্বয় করা হয়নি বলে মন্ত্রণালয়ের দাবি।

মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য অনুযায়ী শুধু ডিজেলেই বিপিসির লিটারপ্রতি প্রায় ৮৯ টাকা লোকসান হচ্ছে।

এতে দৈনিক লোকসান প্রায় ১০৯ কোটি টাকা এবং একই হারে চললে বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। নতুন করে লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বছরে বিপিসির লোকসান প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কমবে বলে সরকারের হিসাব।

সরকার আরও বলছে, প্রতিবেশী ও এশিয়ার কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম কম থাকায় পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি এলএনজি খাতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ব্যয়ের বিষয়টিও মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব শুধু বাসভাড়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে না বলে আশঙ্কা করছেন ভোক্তা অধিকারকর্মীরা। পরিবহন ব্যয় বাড়লে পণ্য পরিবহন, শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিভিন্ন সেবার ব্যয়ও বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়বে ভোক্তার ওপর।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘সরকার এখন বৈশ্বিক সংকটের কথা বলছে। কিন্তু বিপিসি দীর্ঘদিন লাভ করেছে এবং বিপুল অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দিয়েছে। সংকটকালীন সময়ে সেই লাভের অর্থ ব্যবহার করা যেত কি না, বিকল্প কোনো পথ বের করা যেত কি না—সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শিল্প-কলকারখানা, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, গণপরিবহন ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়বে। আর এসব ব্যয়ের শেষ চাপ গিয়ে পড়বে ভোক্তার পকেটে।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের মার্চ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের ব্যবস্থা চালু হয়। এ পদ্ধতিতে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য, আমদানি ব্যয়, শুল্ক-কর, ডলারের বিনিময় হার, বিপিসির মার্জিন, ভ্যাট ও বিতরণ ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। এর মধ্যেই চলতি বছরে এপ্রিলের পর আবার বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি করা হলো।

গত ১৮ এপ্রিল জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর জুনে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দামও বাড়ানো হয়েছিল। জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত সেই দাম বহাল ছিল। ফলে নতুন দর কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরের গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায় কার্যত জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রতিক্রিয়া হিসেবে সামনে এসেছে।

এদিকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজ্জাদ হোসাইন হৃদয়কে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সংসদ।

সোমবার সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে তাঁকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের উপস্থিতিতে সংগঠনের কার্যালয়ে গিয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। নোটিশে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে কেন তাঁর বিরুদ্ধে স্থায়ী সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

এর আগে ফেসবুক পোস্টে সাজ্জাদ হোসাইন হৃদয় লেখেন, ছাত্ররাজনীতির শুরু থেকে বিএনপির যেসব কর্মসূচিতে তিনি অংশ নিয়েছেন, তার অধিকাংশই ছিল তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে। জ্বালানি তেলের নতুন মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদও জানান তিনি।

জ্বালানি তেলের নতুন দর কার্যকর হওয়ার প্রথম দিনেই চট্টগ্রাম নগরের গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু হওয়ায় সামনে ভাড়া সমন্বয় নিয়ে আরও বড় চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বৈঠকের সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং বাস্তবে যাত্রীদের কাছ থেকে কত ভাড়া নেওয়া হবে—এসব বিষয় এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

একদিকে আন্তর্জাতিক বাজার, বিপিসির লোকসান ও জ্বালানি সরবরাহের চাপের কথা বলছে সরকার; অন্যদিকে আয় না বাড়ায় বাড়তি ব্যয় বহনের সক্ষমতা নেই বলে জানাচ্ছেন সাধারণ যাত্রীরা। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে সোমবার থেকেই চট্টগ্রামের সড়কে শুরু হয়েছে ভাড়া নিয়ে নতুন টানাপোড়েন। অর্থাৎ, তেলের দাম বাড়ার ‘প্রথম ধাক্কা’ পড়েছে বাসের ভাড়ায়; এর পরের ধাক্কা কতদূর গড়ায়—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সম্পর্কিত বিষয়

  • গণপরিবহনে ভাড়া

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন