মূল সংবাদে যান
শিক্ষা ও চিকিৎসা

চাটগাঁইয়া ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে!

স্বতন্ত্র ভাষার দাবি, গবেষণায় ঘাটতি আর ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ—দেড় শতাব্দীর বেশি সময় ধরে ভাষাবিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রে চাটগাঁইয়া

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

‘ও ভাই আঁরা চাটগাইয়া নওজোয়ান/ দইজ্জার কূলত বসদ গড়ি/ শিনা–দি ঠেহাই ঝড় তোয়ান/ ফাহার ফরবত সাইগর নদী…’—চট্টগ্রামের মানুষের মুখের ভাষায় লেখা এমন লোকগান শুধু একটি অঞ্চলের কথ্যরীতিই তুলে ধরে না, এর মধ্যে ধরা পড়ে একটি জনপদের ইতিহাস, জীবনযাপন, ভূপ্রকৃতি ও সংস্কৃতির নিজস্ব স্বর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই স্বর কতটা টিকে থাকবে—এ প্রশ্নই এখন সামনে আসছে।

চাটগাঁইয়া ভাষা বাংলা ভাষার উপভাষা, নাকি স্বতন্ত্র ভাষা—এ বিতর্ক বহুদিনের। তবে বিতর্কের বাইরে একটি বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে গুরুত্ব বাড়ছে: চাটগাঁইয়া ভাষার সংরক্ষণ, প্রামাণ্য নথিভুক্তি এবং পূর্ণাঙ্গ ভাষাবৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রয়োজনীয়তা।

ভাষাবিজ্ঞানী জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সন ১৯০৩ সালে প্রকাশিত The Linguistic Survey of India-তে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার ভাষা নিয়ে আলোচনায় চট্টগ্রামের ভাষাকে স্বাতন্ত্র্যসূচক হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর পর্যবেক্ষণে চট্টগ্রামসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ভাষার সঙ্গে প্রমিত বাংলার পার্থক্য এতটাই দৃশ্যমান যে বাংলার অন্য অঞ্চলের মানুষের কাছে তা অনেক সময় দুর্বোধ্য হয়ে উঠত। তিনি চট্টগ্রামের ভাষাকে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার একটি সংযোগকারী ভাষা বা lingua franca হিসেবেও উল্লেখ করেন।

শত বছরের চর্চা, তবু পূর্ণাঙ্গ গবেষণা নেই

চাটগাঁইয়া ভাষা নিয়ে বিশ শতকজুড়ে বিভিন্ন গবেষক ও লেখক কাজ করলেও সমগ্র চট্টগ্রাম অঞ্চলকে ধারণ করে মাঠকর্মভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ গবেষণা এখনো অনুপস্থিত বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৯৩৫ সালে আবদুররশিদ ছিদ্দিকীর চট্টগ্রামী ভাষাতত্ত্ব এবং ড. মুহম্মদ এনামুল হকের চট্টগ্রামী বাঙ্গালার রহস্য-ভেদ প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ড. মনিরুজ্জামানের চট্টগ্রামের উপভাষা প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালে। তবে এসব কাজের পরিসর মূলত বর্তমান চট্টগ্রাম জেলার ভাষা বিশ্লেষণকেন্দ্রিক; পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের ভাষারূপকে একই বিস্তৃত গবেষণার আওতায় আনা হয়নি।

লেখাটিতে বলা হয়েছে, চাটগাঁইয়া ভাষার পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণও এখনো পাওয়া যায়নি। বিদেশেও এ ভাষা নিয়ে পিএইচডি গবেষণা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময় দেশি-বিদেশি ভাষাবিজ্ঞানী, অভিধানকার ও গবেষকেরা চাটগাঁইয়া ভাষা নিয়ে কাজ করেছেন।

চার অভিধান, তবু ভাষার পূর্ণাঙ্গ নথি কোথায়?

চাটগাঁইয়া ভাষার শব্দভাণ্ডার সংরক্ষণে বিভিন্ন সময়ে অভিধানও প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামী বাংলার শব্দসম্ভার, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান, চট্টগ্রামী ভাষার অভিধান ও লোকাচার এবং চট্টগ্রামী বাংলার অভিধান। এরও আগে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পাদিত আঞ্চলিক ভাষার অভিধান-এ চাটগাঁ ভাষার বহু শব্দ ব্যুৎপত্তি ও ব্যবহারসহ সংকলিত হয়েছিল।

অর্থাৎ শব্দভাণ্ডার সংগ্রহে কাজ হলেও ভাষার ধ্বনি, ব্যাকরণ, বাক্যগঠন, অঞ্চলভেদে পরিবর্তন এবং সামাজিক ব্যবহারের সমন্বিত চিত্র এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে নথিভুক্ত হয়নি—লেখাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ এটি।

সাহিত্যে চাটগাঁইয়ার শক্ত উপস্থিতি

চাটগাঁইয়া ভাষা শুধু মানুষের দৈনন্দিন কথোপকথনে সীমাবদ্ধ নেই; বাংলা সাহিত্যেও এর ব্যবহার রয়েছে দীর্ঘদিনের। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবুল ফজল, আহমদ ছফা, সেলিনা হোসেন, হরিশংকর জলদাসসহ বিভিন্ন লেখকের রচনায় চাটগাঁইয়া ভাষার প্রয়োগের উদাহরণ রয়েছে।

এ ছাড়া কাফি কামালের মেইট্টাল পুরোপুরি চাটগাঁইয়া ভাষায় লেখা একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আহমদ ছফার ওঙ্কারও চাটগাঁইয়া ভাষায় রূপান্তরিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। কবিতা, ছড়া ও গানের ক্ষেত্রেও বহু লেখক চাটগাঁইয়া ভাষা ব্যবহার করে চলেছেন।

প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ থেমে গেছে

চাটগাঁইয়া ভাষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক ভাষা উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ লেডি সুজান ম্যালোন চট্টগ্রামের ভাষার ব্যাকরণগত মানোন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ নিয়ে পরামর্শ দেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় চাটগাঁ ভাষা পরিষদ।

সংগঠনটি ২০১০ ও ২০১১ সালে দুটি সেমিনার করে এবং সেসব আলোচনার সংকলন চাটগাঁ ভাষার রূপ-পরিচয় প্রকাশ করে। তবে এরপর দীর্ঘ সময় প্রতিষ্ঠানটির প্রামাণ্য কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

এবার আশার আলো প্রযুক্তিতে

তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি হতাশাজনক নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংয়ের যুগে চাটগাঁইয়া ভাষাকে ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণের উদ্যোগ শুরু হয়েছে। ‘কথন’ প্রকল্পের মাধ্যমে গবেষকেরা এ ভাষার তথ্য সংরক্ষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন বলে লেখাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ উদ্যোগ সফল হলে চাটগাঁইয়া ভাষার শব্দ, উচ্চারণ, বাক্যগঠন ও লোকজ ব্যবহার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ভাষা না উপভাষা—বিতর্কের বাইরে সংরক্ষণ

চাটগাঁইয়া ভাষা স্বতন্ত্র ভাষা কি না—এ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। তবে লেখাটির মূল আহ্বান বিতর্কের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির চেয়ে গবেষণা ও সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

কারণ ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; একটি জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, স্মৃতি, সংস্কৃতি, লোকাচার ও সামাজিক পরিচয়েরও বাহক। চট্টগ্রামের পাহাড়, নদী ও সাগরঘেরা ভূপ্রকৃতির সঙ্গে গড়ে ওঠা জীবন ও সংস্কৃতির নিজস্ব প্রকাশ ঘটেছে চাটগাঁইয়া ভাষায়। হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সহাবস্থানও এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে বলে লেখাটিতে তুলে ধরা হয়েছে।

তাই ‘ভাষা না উপভাষা’ বিতর্কে আটকে না থেকে চাটগাঁইয়া ভাষার মাঠভিত্তিক গবেষণা, পূর্ণাঙ্গ ব্যাকরণ প্রণয়ন, ডিজিটাল আর্কাইভ, অভিধান সম্প্রসারণ এবং সাহিত্য-লোকসংস্কৃতির সংরক্ষণ এখন সময়ের দাবি।

একটি ভাষা হারিয়ে গেলে হারিয়ে যায় শুধু কিছু শব্দ নয়—হারিয়ে যেতে পারে একটি জনপদের বহু প্রজন্মের স্মৃতি, উচ্চারণ, লোকজ জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক স্বর। চাটগাঁইয়া ভাষার ক্ষেত্রেও তাই প্রশ্নটি কেবল ভাষাবিজ্ঞানের নয়; এটি চট্টগ্রামের নিজস্ব সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণের প্রশ্ন।

সম্পর্কিত বিষয়

  • চাটগাঁইয়া ভাষা

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন