মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

বৃষ্টি কমলেও ডেঙ্গুর দাপট, চট্টগ্রামে দুই মাসে ৩১ জনের মৃত্যু

সেপ্টেম্বরে-অক্টোবরে আক্রান্ত ৫ হাজারের বেশি, বছরের প্রথম আট মাসে ছিল ২ হাজার; চমেকে বারান্দার মেঝেতে চিকিৎসা, মশারি-ফ্যান-স্যালাইনের সংকট

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

বৃষ্টিপাত কমেছে, কিন্তু কমছে না ডেঙ্গুর সংক্রমণ। বরং চট্টগ্রামে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। এই দুই মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৫ হাজার ৩৮ জন, মৃত্যু হয়েছে ৩১ জনের। অথচ বছরের প্রথম আট মাসে আক্রান্ত ছিলেন ২ হাজার ২৩ জন। অর্থাৎ বছরের প্রথম আট মাসের তুলনায় মাত্র দুই মাসে আক্রান্তের সংখ্যা আড়াই গুণের বেশি। পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে। ডেঙ্গু ওয়ার্ডে স্থান সংকুলান না হওয়ায় রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে বারান্দার মেঝেতে। অনেকের নেই মশারি, স্যালাইন স্ট্যান্ড কিংবা ফ্যান। ভ্যাপসা গরমে রোগীদের হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন স্বজনেরা। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা চলতি নভেম্বরেও অব্যাহত থাকতে পারে।

এদিকে ডেঙ্গু ও হামের উপসর্গে সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে রোগ দুটিতে আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৪৬২ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ডেঙ্গু-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গুতে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৯৭০ জন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ৪৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৯ জনে। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৬ হাজার ১৭ জন।

অন্যদিকে, হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে ৫৬ জনের নিশ্চিত সংক্রমণসহ ১ হাজার ৪৯২ জনের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত সংক্রমণে মোট মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ২৫৭ জনের। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০৫ জন এবং উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ১৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে মোট ২ লাখ ৩১ হাজার ৫০৫ জন সন্দেহজনক আক্রান্ত হয়েছেন। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৪৮ জন।

চট্টগ্রামে দুই মাসেই ৮৬ শতাংশ মৃত্যু

চট্টগ্রামে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসেই মারা গেছেন ৩১ জন। অর্থাৎ বছরের মোট মৃত্যুর প্রায় ৮৬ শতাংশ ঘটেছে মাত্র দুই মাসে। আক্রান্তের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বছরের প্রথম আট মাসে যেখানে আক্রান্ত ছিলেন ২ হাজার ২৩ জন, সেখানে পরবর্তী দুই মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৫ হাজার ৩৮ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে ৯০০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া খুলনায় ২৯৪, চট্টগ্রামে ২৫২, বরিশালে ১৮৩, রাজশাহীতে ১৫৩, ময়মনসিংহে ৯৫, রংপুরে ৭১ ও সিলেটে ২২ জন ভর্তি হয়েছেন।

গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া ছয়জনের মধ্যে ঢাকার তিনজন, ময়মনসিংহের দুজন এবং সিলেট বিভাগের একজন রয়েছেন।

চট্টগ্রামে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ৩ হাজার ৩১৮ জন, নারী ২ হাজার ১৪৩ জন এবং শিশু ১ হাজার ৭০০ জন। মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। এ বছর ডেঙ্গুতে সাতজন পুরুষ, ১৯ জন নারী ও ১০ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ নারী ও শিশু মিলিয়ে মারা গেছেন ২৯ জন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৮০ শতাংশ।

চমেকে বারান্দার মেঝেতে চিকিৎসা

ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ডেঙ্গু ওয়ার্ডে জায়গা না থাকায় অনেক রোগীকে বারান্দার মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। তাঁদের অনেকের জন্য নেই মশারি। স্যালাইন স্ট্যান্ডের স্বল্পতায় ওয়ার্ডের জানালায় ঝুলিয়ে স্যালাইন দিতে দেখা গেছে রোগীদের। নেই পর্যাপ্ত ফ্যানের ব্যবস্থাও। ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস করছেন রোগীরা। স্বজনদের কেউ কেউ হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন।

বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৩ জন, ফৌজদারহাট বিআইটিআইডি হাসপাতালে ১৯ জন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে সাতজন, চট্টগ্রাম সিএমএইচ হাসপাতালে দুজন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ জন এবং বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে ১৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

নভেম্বরেও সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত জুন-জুলাই থেকে ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে আক্রান্তের হার তুলনামূলকভাবে কমে আসার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু এবার জুন-জুলাইয়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি ছিল না। আগস্ট থেকে রোগী বাড়তে শুরু করে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে তা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এ ধারা নভেম্বরেও চলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাতের হার কমেছে। কিন্তু সেই অনুপাতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমছে না। ফলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু বৃষ্টির ওপর নির্ভর না করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও জমে থাকা পানি অপসারণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদেরও সচেতন হতে হবে। কোনো স্থানে যাতে তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

আতঙ্ক নয়, সতর্কতা জরুরি

ডেঙ্গু চিকিৎসায় আতঙ্কিত না হয়ে সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। তাঁদের মতে, ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ফ্লুইড ম্যানেজমেন্ট বা শরীরে তরলের ভারসাম্য বজায় রাখা। এনএসওয়ান পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হলেই প্রত্যেক রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে রোগীর শারীরিক অবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ উপসর্গ ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. এ এস এম জাহেদ বলেন, ডেঙ্গু হলে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি, বিশেষ করে হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগী এবং গর্ভবতী নারীদের সতর্ক থাকতে হবে। তাঁদের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

তিনি বলেন, এখন জ্বর হলে সাধারণ ভাইরাস জ্বর মনে করে বসে থাকা যাবে না। জ্বর হলে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে। ডেঙ্গু হলে পূর্ণ বিশ্রাম নিতে হবে, এ সময় ভ্রমণ করা যাবে না। বেশি করে তরলজাতীয় খাবার খেতে হবে। ফলের রস, ডাবের পানি, লেবুর পানি, খাবার স্যালাইন ও সাধারণ পানি পান করতে হবে। কোনো ধরনের শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে হাসপাতালে যেতে হবে।

চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। কিন্তু প্লাটিলেট কমলেই সব ক্ষেত্রে রক্ত বা প্লাটিলেট দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। রোগীর রক্তক্ষরণ, শারীরিক অবস্থা ও অন্যান্য জটিলতা বিবেচনায় চিকিৎসা দিতে হয়। জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে পারে। তাই এ সময় বিশেষ সতর্ক থাকা জরুরি।

আগের বছরগুলোর চিত্র

বাংলাদেশে ২০২৩ সালে ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার ঘটে। ওই বছর ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হন, মারা যান ১ হাজার ৭০৫ জন। এরপর ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন, মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের। ২০২৫ সালে আক্রান্ত হন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন, মারা যান ৪১৩ জন।

চট্টগ্রামেও গত কয়েক বছরে ডেঙ্গুর প্রকোপ ওঠানামা করেছে। ২০২৫ সালে আক্রান্ত হয়েছিলেন ৪ হাজার ৮৬৪ জন, মারা যান ২৭ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্ত ৪ হাজার ৩২৩ জনের মধ্যে মারা যান ৪৫ জন। ২০২৩ সালে আক্রান্ত হন ১৪ হাজার ৮৭ জন, মৃত্যু হয় ১০৭ জনের।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের সংক্রমণ ও মৃত্যুর চিত্র বলছে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় চট্টগ্রামে নতুন করে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বিবেচনায় পর্যাপ্ত শয্যা, মশারি, স্যালাইন স্ট্যান্ড ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • ডেঙ্গু

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন