মূল সংবাদে যান
অপরাধ

বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিতে সিপিএর জিরো টলারেন্স, ভাসমান গুদাম ঠেকাতে যৌথ অভিযান

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানরত পণ্যবাহী জাহাজকে ‘ভাসমান গুদাম’ হিসেবে ব্যবহার করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য,

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

বিশেষ করে গম, অবৈধভাবে মজুদ রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরির আশঙ্কা ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ)।

এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডকে সঙ্গে নিয়ে বুধবার (১২ আগস্ট) বহির্নোঙর ও কর্ণফুলী চ্যানেলে বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

অভিযানে পণ্যবাহী জাহাজের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি কর্ণফুলী চ্যানেল ও বহির্নোঙর এলাকায় বিভিন্ন নৌযানে তল্লাশি ও যাচাই করা হয়। একই অভিযানে মূল নেভিগেশনাল চ্যানেলে অবৈধভাবে মাছ ধরার জাল স্থাপন করে জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অভিযোগে ২৮ জনকে আটক করা হয়। ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তাদের মধ্যে ২৪ জনকে এক মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, দেশের প্রধান সামুদ্রিক প্রবেশদ্বার হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের সঙ্গে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহও সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই কোনো অসাধু ব্যক্তি বা চক্র যাতে জাহাজে পণ্য আটকে রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বড় অংশ পরিচালিত হওয়ায় বহির্নোঙরের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি শুধু বন্দর নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি সরাসরি বাজারব্যবস্থা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গেও যুক্ত। ফলে পণ্য জাহাজে আসার পর নির্ধারিত সময়ে খালাস ও পরিবহন নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ কমবে, অন্যদিকে তেমনি বন্দরের নৌ নিরাপত্তাও আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বন্দর সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পণ্য পরিবহনে সমুদ্রপথের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা ক্রমেই বাড়ছে। চট্টগ্রাম বন্দরে আসা বিভিন্ন পণ্যবাহী জাহাজ থেকে পণ্য খালাস, লাইটার জাহাজে স্থানান্তর এবং পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহনের পুরো প্রক্রিয়ায় সামান্য বিলম্বও বাজারে সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণে বহির্নোঙরে অবস্থানরত মাদারশিপ ও লাইটার জাহাজের কার্যক্রমে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে কোনো জাহাজ ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘ সময় নোঙর করে রেখে পণ্য আটকে রাখছে কি না, কিংবা খালাসযোগ্য পণ্য নির্ধারিত সময়ে বাজারে না পাঠিয়ে মজুদ করা হচ্ছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হচ্ছে।

বন্দর সচিব জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে আসা পণ্যবাহী জাহাজ বন্দর ত্যাগের পর নির্ধারিত ৭২ ঘণ্টার মধ্যে পণ্য নির্ধারিত এলাকায় পৌঁছানো বা খালাসের বিধান যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, অভিযানে সেটিও বিশেষভাবে দেখা হয়েছে। অযথা বিলম্ব, পণ্য আটকে রাখা বা পরিবহন ব্যবস্থায় কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে যাতে বাজারে সংকট সৃষ্টি করা না যায়, সে জন্য সংশ্লিষ্টদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানরত জাহাজ মূলত পণ্য খালাসের অপেক্ষায় থাকে। কোনো কারণে খালাস বা পরিবহন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হলে পণ্য জাহাজেই পড়ে থাকতে পারে। তবে পরিকল্পিতভাবে কোনো পণ্য দীর্ঘ সময় জাহাজে রেখে বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে তা কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

বিশেষ করে গম, ভোজ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি বাজারে দ্রুত প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে পণ্য আমদানির পর তা কোথায় যাচ্ছে, কত সময়ের মধ্যে খালাস হচ্ছে এবং কোনো জাহাজে অস্বাভাবিক সময় ধরে পণ্য আটকে আছে কি না—এসব তথ্যের ওপর নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অভিযানের সময় বহির্নোঙরে অবস্থানরত লাইটার জাহাজ ও মাদারশিপের চালকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রযোজ্য নিয়ম ও নির্দেশনা মেনে চলার জন্য সতর্ক করা হয়। জাহাজে লোড করা পণ্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খালাস ও পরিবহনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তবে বুধবারের অভিযানে শুধু পণ্য মজুদ বা পরিবহন ব্যবস্থাই নয়, বন্দরের নিরাপদ নৌ চলাচলও গুরুত্ব পায়। কর্ণফুলী চ্যানেল ও বহির্নোঙর এলাকায় তল্লাশির সময় মূল নেভিগেশনাল চ্যানেলে অবৈধভাবে মাছ ধরার জাল স্থাপনের বিষয়টি সামনে আসে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, নেভিগেশনাল চ্যানেলে এ ধরনের জাল স্থাপন বড় জাহাজ চলাচলের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। জাহাজের প্রপেলার বা অন্যান্য যন্ত্রাংশে জাল আটকে গেলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, ব্যাহত হতে পারে বন্দরের নৌ চলাচল এবং তৈরি হতে পারে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি। এ কারণে অভিযানে ২৮ জনকে আটক করা হয়।

তাদের মধ্যে ২৪ জনকে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জেলেদের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে লিফলেট বিতরণ করা হয়। নেভিগেশনাল ও শিপিং চ্যানেলে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি না করার বিষয়ে তাদের সতর্ক করা হয়।

বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে রেডিও চ্যানেল ব্রডকাস্টের মাধ্যমেও নৌযান ও নাবিকদের সতর্ক করা হয়েছে। ভিএইচএফ চ্যানেল ১২ ও ১৬-এ প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রচার করে মূল নেভিগেশনাল চ্যানেল ও শিপিং চ্যানেলে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়।

বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, নেভিগেশনাল নিরাপত্তা শুধু বড় জাহাজের নিরাপদ চলাচলের জন্য নয়; এর সঙ্গে বন্দরের পণ্য পরিবহন, জাহাজের সময়সূচি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধারাবাহিকতাও জড়িত। কোনো একটি স্থানে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলে পুরো নৌপথের কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়তে পারে। যৌথ অভিযানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের একটি পাইলট ভেসেল, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি জাহাজ ও দুটি বোট এবং বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের একটি জাহাজ ও দুটি বোট অংশ নেয়।

অভিযানের মাধ্যমে বহির্নোঙর, কর্ণফুলী চ্যানেল ও সংশ্লিষ্ট নৌপথে সমন্বিত নজরদারির বার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বন্দর, নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ টহল আরও জোরদার করার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম জানান, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের স্বাভাবিক সরবরাহ এবং জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে বন্দর ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।

তিনি বলেন, বহির্নোঙরে অবস্থানরত জাহাজে পণ্য অবৈধভাবে মজুদ, জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার, পণ্য খালাসে অযথা বিলম্ব কিংবা বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির কোনো চেষ্টা শনাক্ত হলে তা যাচাই করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একইভাবে নেভিগেশনাল চ্যানেলে অবৈধ জাল স্থাপন বা জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির বিরুদ্ধেও অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • চট্টগ্রাম বন্দর
  • ভাসমান গুদাম

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন