চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে—মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে লড়াই শুধু পুলিশের দায়িত্ব নয়| এটি পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি খাত এবং রাষ্ট্রের সমন্বিত দায়িত্ব| অনলাইন জুয়া কোনো বিনিয়োগ নয়; এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে দীর্ঘমেয়াদে লাভ নিশ্চিত থাকে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের| একইভাবে মাদক কেবল একজন ব্যক্তিকে নয়, একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি প্রজন্মকে ধ্বংস করতে পারে|
চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে আনোয়ারা ও রাঙামাটির ঘটনাগুলো তাই কেবল অপরাধের খবর নয়; এগুলো আমাদের সময়ের নির্মম সতর্কবার্তা| এখনই কার্যকর প্রতিরোধ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, আর্থিক নজরদারি এবং সামাজিক সচেতনতা একসঙ্গে জোরদার না হলে ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডির সংখ্যা আরও বাড়বে| ঘটনা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, মাদক ও অনলাইন জুয়া এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি জন স্বাস্থ্য, পারিবারিক নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে|
‘১০০ টাকা লাগান, জিতলে ২৫০ টাকা পাবেন’—মোবাইল ফোনের পর্দায় এমন একটি বিজ্ঞাপন দেখেই শুরু| প্রথমে সামান্য কিছু টাকা জেতানো হয়| এরপর বাড়তে থাকে আত্মবিশ্বাস, বাড়তে থাকে বাজির পরিমাণ| একসময় নিজের সঞ্চয়, ব্যবসার মূলধন, বন্ধুর কাছ থেকে ধার করা টাকা—সবকিছুই চলে যায় অনলাইন জুয়ার অ্যাপে| শেষ পর্যন্ত লাভ নয় বরং ঋণ, হতাশা ও নিঃসঙ্গতাই হয় পরিণতি|
অন্যদিকে, মাদকের নেশায় হারিয়ে যাচ্ছে বিবেক, ভেঙে পড়ছে পরিবার| যে সন্তান একসময় মা-বাবার ভরসা ছিল, সেই সন্তানই হয়ে উঠছে পরিবারের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি| আবার কোথাও দীর্ঘদিনের নির্যাতন, অসহায়ত্ব ও মানসিক চাপে মা-বাবাই অভিযুক্ত হচ্ছেন সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায়|
সম্প্রতি চট্টগ্রামের আনোয়ারায় মাদকাসক্ত ছেলের ছুরিকাঘাতে মা-বাবা স্বপন দাশ গুপ্ত ও কল্পনা দাশ নিহত হওয়ার অভিযোগ দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে| স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত যুবক দীর্ঘদিন ধরে মাদকাসক্ত ছিলেন| তাকে একাধিকবার পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি| পারিবারিক কলহ একসময় ভয়াবহ পরিণতির দিকে গড়ায়|
একই দিনে রাঙামাটিতে মাদকাসক্ত ছেলে সাকিবুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগে তার মা-বাবাকে আটক করে পুলিশ| তদন্ত চলছে, তবে ঘটনাটি দীর্ঘদিনের পারিবারিক সংকট ও আসক্তির ভয়াবহ দিকটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে| এই দুই ঘটনার মধ্যে একটি মিল রয়েছে—মাদক একটি পরিবারকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে ভালোবাসার সম্পর্কও সহিংসতায় রূপ নেয়|
সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়| অতীতেও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় মাদকাসক্তির কারণে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে| কাজীর দেউড়িতে মাদকাসক্ত ছেলের হাতে বাবার মৃত্যু, পাহাড়তলীতে মাদকের টাকার জন্য মাকে হত্যার অভিযোগ, বাঁশখালীতে বাবাকে হত্যার ঘটনা—এসব সংবাদ বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে|
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মাদকাসক্তির সঙ্গে পারিবারিক সহিংসতা, চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা ও অন্যান্য অপরাধের যোগসূত্র দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে| একসময় জুয়ার আসর বলতে বোঝাত নির্দিষ্ট কোনো স্থান| এখন সেই আসর চলে এসেছে স্মার্টফোনের পর্দায়|
চট্টগ্রাম নগর থেকে উপজেলা, এমনকি প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে পড়েছে| স্মার্টফোন, মোবাইল ইন্টারনেট এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে প্রতিদিন হাজারো মানুষ বিভিন্ন বেটিং প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছেন|
চলতি ২০২৬ সালে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত অভিযানে অনলাইন জুয়া ও সংশ্লিষ্ট অপরাধে অন্তত ছয়জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেছে| গত মে মাসে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) অনলাইন বেটিং ও অর্থপাচার চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে|
অভিযানে মোবাইল ফোন, এটিএম কার্ড, চেকবইসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়| পরে জুলাই মাসে পটিয়ায় মোবাইল ফোন ব্যবহার করে অনলাইন জুয়া পরিচালনার অভিযোগে আরও এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়| তার কাছ থেকে তিনটি স্মার্টফোন উদ্ধার করা হয়| এসব ঘটনা দেখাচ্ছে, অনলাইন জুয়ার বিস্তার এখন আর নগরকেন্দ্রিক নয়; উপজেলা পর্যায়েও এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে|
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলো অত্যন্ত পরিকল্পিত মনস্তাত্ত্বিক কৌশল ব্যবহার করে| নতুন খেলোয়াড়দের শুরুতেই ছোট অঙ্কের টাকা জিততে দেওয়া হয়| এরপর দেওয়া হয় বোনাস, ক্যাশব্যাক, রেফারেল কমিশন কিংবা ‘ফ্রি বেট’-এর প্রলোভন|
একজন খেলোয়াড় যখন মনে করেন তিনি নিয়মিত লাভ করতে পারবেন, তখনই তিনি বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ শুরু করেন| বড় অঙ্কের টাকা জিতলেও অধিকাংশ প্ল্যাটফর্মে টাকা উত্তোলনের আগে নানা শর্ত দেওয়া হয়| নির্দিষ্ট সংখ্যক বাজি সম্পন্ন না করলে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ থাকে না| ফলে খেলোয়াড় আবার খেলতে বাধ্য হন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের মূলধনও হারিয়ে ফেলেন|
অনলাইন জুয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি স্থানীয় এজেন্ট নেটওয়ার্ক| এজেন্টরা নতুন খেলোয়াড়ের অ্যাকাউন্ট খুলে দেন, টাকা জমা দিতে সহায়তা করেন এবং নতুন সদস্য সংগ্রহ করেন| একজন এজেন্ট আবার আরও কয়েকজন এজেন্ট ˆতরি করেন| এভাবেই শহর থেকে উপজেলা হয়ে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয় পুরো নেটওয়ার্ক| একটি ওয়েবসাইট বন্ধ হলেও অল্প সময়ের মধ্যে নতুন ডোমেইন, নতুন অ্যাপ কিংবা নতুন টেলিগ্রাম বা মেসেঞ্জার গ্রুপ চালু হয়ে যায়|
সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে সংগ্রহ করা অর্থ বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস এবং অন্যান্য আর্থিক মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়| বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল অ্যাপ বন্ধ করে এই নেটওয়ার্ক ভাঙা সম্ভব নয়; অর্থ লেনদেনের পুরো চেইন শনাক্ত করতে হবে| দ্রুত ধনী হওয়ার স্বপ্ন, বেকারত্ব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণা এবং সহজ ডিজিটাল লেনদেন তরুণদের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ফেলছে| অনেক শিক্ষার্থী ও তরুণ চাকরিজীবী প্রথমে বিনোদনের জন্য খেললেও পরে আসক্ত হয়ে পড়েন| একসময় ধারদেনা, ঋণ, এমনকি পরিবারের টাকা আত্মসাতের ঘটনাও ঘটে|
মাদকের সামাজিক মূল্য আরও ভয়াবহ| মাদকের প্রভাব শুধু একজন মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না| একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি ধীরে ধীরে— পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক হারান, কর্মক্ষমতা হারান, মানসিক ভারসাম্য হারান, আর্থিক সংকটে পড়েন, সহিংস হয়ে উঠতে পারেন| মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অনেকেই চুরি, ছিনতাই, প্রতারণা কিংবা সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়েন| পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাও বাড়ছে|
সংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েকটি কারণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে— বেকারত্ব ও দ্রুত ধনী হওয়ার মানসিকতা, সহজলভ্য স্মার্টফোন ও উচ্চগতির ইন্টারনেট, মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল লেনদেনের অপব্যবহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনলাইন জুয়ার প্রচারণা, পরিবারে সচেতনতার অভাব, মাদকাসক্তিকে সামাজিক লজ্জার কারণে গোপন রাখা, পর্যাপ্ত পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা|
প্রয়োজন— মাদক সরবরাহকারী ও অনলাইন জুয়ার মূল হোতাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান, অনলাইন জুয়ার অর্থ লেনদেন বন্ধে প্রযুক্তিগত নজরদারি, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন পর্যবেক্ষণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কর্মসূচি, পরিবারভিত্তিক কাউন্সেলিং, সহজলভ্য ও মানসম্মত পুনর্বাসন কেন্দ্র, স্থানীয় প্রশাসন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের সমন্বিত উদ্যোগ|
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবারের সদস্যদের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন—অস্বাভাবিক রাগ, অতিরিক্ত গোপনীয়তা, অর্থের অস্বাভাবিক চাহিদা, নতুন সন্দেহজনক বন্ধুবৃত্ত, রাতজাগা কিংবা হঠাৎ জীবনযাত্রার পরিবর্তন—এসব লক্ষণকে গুরুত্ব দিতে হবে| প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসক, কাউন্সেলর, পুনর্বাসন কেন্দ্র কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা নিতে হবে|
