মূল সংবাদে যান
অপরাধ

চউকের প্লট বরাদ্দে ‘বেনামি লেনদেন’ ও কোটি টাকার জালিয়াতির অভিযোগ, তদন্ত দুদক

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) মূল্যবান আবাসিক প্লট বরাদ্দকে ঘিরে ক্ষমতার অপব্যবহার, নীতিমালা লঙ্ঘন এবং বেনামি লেনদেনের মাধ্যমে কোটি টাকার জালিয়াতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত অনুসন্ধানে শুরু করেছে।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
চউকের প্লট বরাদ্দে ‘বেনামি লেনদেন’ ও কোটি টাকার জালিয়াতির অভিযোগ, তদন্ত দুদক

অনুসন্ধানী নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সংস্থাটির সাবেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন ও তৎকালীন চউকের প্রভাবশালী বোর্ড সদস্য, হাটহাজারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইউনুস গণি চৌধুরীর যোগসাজশে এই অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বোর্ড সদস্য হিসেবে নিজ নামে প্লট গ্রহণে বিধিনিষেধ থাকায় ইউনুস গণি চৌধুরী অন্য ব্যক্তির নামে প্লট বরাদ্দ নিয়ে পরবর্তীতে তা নিজের নিয়ন্ত্রণে নেন। পরে সেই প্লট তার স্ত্রী জাকিয়া বেগমের নামে রেজিস্ট্রি করা হয়। আইনজ্ঞদের ভাষায়, এটি ‘বেনামি লেনদেন’-এর একটি ক্লাসিক উদাহরণ। একই কৌশলে আরও সাত থেকে আটটি প্লট হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

‘বিশেষ বিবেচনা’ ক্যাটাগরি সৃষ্টির নেপথ্যে প্রশ্ন

অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০০৮ সালে অনুমোদিত অনন্যা আবাসিক প্রকল্পের মূল নীতিমালায় ‘বিশেষ বিবেচনা’ নামে কোনো ক্যাটাগরি ছিল না। কিন্তু ২০১৩ সালের ২১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত চউকের ৪০৫তম বোর্ড সভায় বিধিবহির্ভূতভাবে নতুন এই ক্যাটাগরি যুক্ত করা হয়।

এই সুবিধার আওতায় তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের প্রভাবশালী ব্যক্তি, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং কর্মকর্তাদের প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ৫৯ জনের তালিকায় আওয়ামী লীগের কয়েকজন এমপির পাশাপাশি মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ২১ নভেম্বর তাকে ৩ দশমিক ৮০ কাঠার ডি-৩১৪এ নম্বর প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন—একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে নিজেকে ‘বিশেষ বিবেচনা’ ক্যাটাগরির যোগ্য আবেদনকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করলেন এবং কোন ভিত্তিতে তিনি এই সুবিধা পেলেন।

বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই গোপন বরাদ্দ

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আবাসিক প্লট বরাদ্দ প্রবিধানমালা, ১৯৯৮ অনুযায়ী, কোনো প্লট বরাদ্দের আগে অন্তত চারটি বহুল প্রচারিত জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আবেদন আহ্বান বাধ্যতামূলক। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত হয় যে “উচ্চপদস্থ ব্যক্তি” এবং “প্লট সংকট”-এর কারণ দেখিয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রয়োজন নেই।

ফলে পুরো বরাদ্দ প্রক্রিয়াটি গোপনীয়ভাবে সম্পন্ন হয় এবং সাধারণ আবেদনকারীরা প্রতিযোগিতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগেই আশরাফুল আমিন নিজের জন্য মূল্যবান প্লট বরাদ্দ নিশ্চিত করেন।

১২০ দিনের মধ্যে লিজ ও হস্তান্তর

নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ আশরাফুল আমিন প্লট রেজিস্ট্রির আবেদন করেন। ১১ এপ্রিল লিজ এগ্রিমেন্ট সম্পন্ন হয়। এরপর মাত্র দুই মাসের মাথায়, ১৬ জুন তিনি প্লট হস্তান্তরের আবেদন করেন এবং ১১ আগস্ট চূড়ান্ত রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়।

মাত্র ১২০ দিনের মধ্যে লিজ গ্রহণ ও হস্তান্তরের এই দ্রুত প্রক্রিয়াকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগকারীদের দাবি, প্লটটি প্রকৃত আবাসিক ব্যবহারের জন্য নেওয়া হয়নি; বরং শুরু থেকেই এটি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ও পূর্বপরিকল্পিতভাবে হস্তান্তরের জন্য বরাদ্দ নেওয়া হয়েছিল।

হলফনামায় অসত্য তথ্যের অভিযোগ

প্লট বরাদ্দের সময় দেওয়া হলফনামায় আশরাফুল আমিন উল্লেখ করেন, চট্টগ্রাম শহরে তার বা তার পরিবারের নামে কোনো প্লট নেই এবং বরাদ্দকৃত প্লটটি তিনি নিজ আবাসনের জন্য ব্যবহার করবেন।

কিন্তু লিজ গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই প্লটটি ইউনুস গণি চৌধুরীর স্ত্রী জাকিয়া বেগমের কাছে হস্তান্তর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে তার দেওয়া হলফনামার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট আইনজ্ঞদের মতে, সরকারি সম্পদ বরাদ্দের ক্ষেত্রে অসত্য তথ্য প্রদান এবং আবাসিক প্লটকে বাণিজ্যিক লেনদেনের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা বিদ্যমান আইন ও নীতিমালার পরিপন্থী হতে পারে।

বিক্রয়মূল্য ও গোপন লেনদেনের প্রশ্ন

ফতেয়াবাদ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১১ আগস্ট প্লটটি ৩৪ লাখ ২০ হাজার টাকায় জাকিয়া বেগমের কাছে বিক্রি দেখানো হয়। অথচ স্থানীয়দের দাবি, ওই এলাকায় প্রতি কাঠার বাজারমূল্য তখন ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকার মধ্যে ছিল।

এ অবস্থায় ঘোষিত মূল্যের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ লেনদেন হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

আবাসিক প্লট বন্ধক রেখে বাণিজ্যিক ঋণ

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, পরবর্তীতে জাকিয়া বেগম প্লটটি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের সিডিএ এভিনিউ শাখার অনুকূলে বন্ধক রেখে বাণিজ্যিক ঋণ গ্রহণের জন্য ২০২৩ সালের ৫ এপ্রিল চউক থেকে ছাড়পত্র নেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আবাসিক প্লটকে বাণিজ্যিক ঋণের কাজে ব্যবহার প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

আশরাফুল আমিনের বক্তব্যে অসামঞ্জস্য

প্লট বরাদ্দের বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন দাবি করেন, অর্থের অভাবে তিনি প্লট গ্রহণ কিংবা বুঝে নেননি।

তবে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সংরক্ষিত দলিল অনুযায়ী দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট প্লট তার নামে রেজিস্ট্রি হওয়ার পর সেটি ইউনুস গণি চৌধুরীর স্ত্রীর নামে হস্তান্তর সম্পন্ন হয়। ফলে তার বক্তব্যের সঙ্গে নথিগত তথ্যের স্পষ্ট অসামঞ্জস্য দেখা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ক্ষেত্রে এ ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও আচরণবিধির প্রশ্ন তোলে।

দুদকের তদন্তে আশরাফুল আমিন

চউকের প্লট কেলেঙ্কারির পাশাপাশি বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনে (বিএসসি) দায়িত্ব পালনকালেও আশরাফুল আমিনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বিএসসির তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এবং উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) তারেক-উল ইসলামের সঙ্গে যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার ও আর্থিক অনিয়মের ঘটনা ঘটতে পারে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শুরু করেছে।

জানা গেছে, ২০২৬ সালের ২২ জানুয়ারি দুদক তিন সদস্যের একটি তদন্ত টিম গঠন করে। পরবর্তীতে ৫ ফেব্রুয়ারি আশরাফুল আমিনসহ সংশ্লিষ্টদের সশরীরে হাজির হওয়ার জন্য তলব করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর নথিপত্র যাচাইয়ের জন্য সময় দেওয়া হয়েছে বলেও সূত্র জানিয়েছে।

সম্ভাব্য আইনি জটিলতা

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হতে পারে।

এসব অপরাধে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড, চাকরিচ্যুতি কিংবা প্রশাসনিক শাস্তির বিধান রয়েছে।

জনমনে উদ্বেগ

বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন। অতীতের এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তার বর্তমান দায়িত্ব পালন নিয়েও জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সুশাসন ও নগর প্রশাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নগরবাসীর করের টাকায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।

তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা আদালত বা তদন্ত সংস্থা দ্বারা চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের আইনি অধিকার ও বক্তব্য বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন বলেও মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সম্পর্কিত বিষয়

  • চউক
  • দুদক

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন