মূল সংবাদে যান
অপরাধ

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ষষ্ঠ দিনে : ইরানে নিহত বেড়ে ১ হাজার ২৩১

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত ষষ্ঠ দিনে গড়িয়েছে। নতুন করে ইরানজুড়ে বড় ধরনের বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন স্থানে ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত রয়েছে, আর পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইরানও।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ষষ্ঠ দিনে : ইরানে নিহত বেড়ে ১ হাজার ২৩১

গত শনিবার শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত হামলায় ইরানে এখন পর্যন্ত অন্তত ১,২৩১ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে লেবাননেও ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা জোরদার হয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচী অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক এলাকায় হামলা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, এসব হামলার প্রভাব বিশ্ববাজারেও পড়েছে।

জ্বালানির দাম বেড়েছে, মুদ্রাবাজার অস্থিতিশীল হয়েছে এবং বিশ্বজুড়ে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। তার অভিযোগ, হামলাকারীরা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন স্থানকে লক্ষ্যবস্তু করছে, যেখানে বেশি প্রাণহানি ও দুর্ভোগ সৃষ্টি করা সম্ভব।

ইরানি সূত্রগুলোর দাবি, গত শনিবার থেকে দেশজুড়ে প্রায় দুই হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হয়েছে। দক্ষিণ ইরানের মিনাব এলাকায় একটি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় প্রায় ২০০ জন নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ জানিয়েছে, তেহরানের দক্ষিণ-পশ্চিমের পারান্দ শহরের দুটি স্কুলেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে, যাতে আশপাশের আবাসিক ভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, হামলার মধ্যে ইরানের স্বাস্থ্য অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংস্থাটি অন্তত ১৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার সত্যতা পেয়েছে। এতে চারজন স্বাস্থ্যকর্মী নিহত এবং ২৫ জন আহত হয়েছেন। চারটি অ্যাম্বুলেন্সও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের ষষ্ঠ দিনে বৃহস্পতিবার তেহরানে বোমাবর্ষণ আরও তীব্র হয়েছে। বিস্ফোরণের মধ্যে তেহরানের এক বাসিন্দা মোহাম্মদরেজা জানান, পরিস্থিতি আগের দিনের চেয়েও ভয়াবহ।

তার ভাষায়, “উত্তর তেহরানে হামলা চলছে, আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। পুরো শহর যেন যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।”

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, তেহরানের একটি ক্রীড়া স্টেডিয়াম হামলায় ধ্বংস হয়ে গেছে। দেশটির জ্বালানিমন্ত্রী আব্বাস আলিবাদি বলেছেন, হামলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সাইবার নজরদারি সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, ইরানে প্রায় সম্পূর্ণ ইন্টারনেট শাটডাউন পঞ্চম দিনে প্রবেশ করেছে এবং স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ইন্টারনেট ব্যবহার এখন প্রায় ১ শতাংশে নেমে এসেছে।

অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, গত ছয় দিনে তাদের পাল্টা হামলায় কুয়েত, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা অন্তত ২০টি মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরাকের ইরবিলে মার্কিন ঘাঁটিতেও ড্রোন হামলার দাবি করেছে তারা।

এদিকে লেবাননে গত সোমবার থেকে চলা ইসরায়েলি হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৭ জন নিহত এবং ৫২৭ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। হিজবুল্লাহ সক্রিয় হওয়ার পর বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলসহ দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননের বিভিন্ন স্থানে হামলা জোরদার করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। বৈরুতের দক্ষিণের বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

ইরানের হামলার আশঙ্কায় সংযুক্ত আরব আমিরাত দেশজুড়ে জরুরি সতর্কতা জারি করেছে। সরকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৩১টি ড্রোন প্রতিহত করেছে, যদিও একটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ছয়টি ড্রোন আমিরাতের ভূখণ্ডে আঘাত হেনেছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সতর্ক করে বলেছেন, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো নীরব থাকলে তাদেরও একসময় এর মূল্য দিতে হবে।

তবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমার জানিয়েছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা নেই যুক্তরাজ্যের। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিমানকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করে হামলা চালানোর অনুমতিও দেওয়া হয়নি।

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে হামলার একটি উদ্দেশ্য হলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা।

এদিকে যুদ্ধের প্রভাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রায় ২০ হাজার নাবিক ও ১৫ হাজার ক্রুজ জাহাজের যাত্রী আটকা পড়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থা (আইএমও)।

সংস্থাটির মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ জানিয়েছেন, জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে কাজ করছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ওই অঞ্চলে জাহাজে হামলার সাতটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যাতে দুইজন নিহত ও সাতজন আহত হয়েছেন।

এদিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিও প্রায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবহন এই জলপথ দিয়ে হয়। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি ইরান সমুদ্র মাইন ব্যবহার করে পথটি বন্ধ করে দেয়, তবে তা পরিষ্কার করতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

ইতিমধ্যে সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১২ শতাংশ এবং ইউরোপীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • মধ্যপ্রাচ্য
  • সংঘাত

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন