মূল সংবাদে যান
অপরাধ

প্রশাসনের নিরবতায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে এলপিজি

সিলিন্ডারপ্রতি ৮০০ টাকা বেশিতে সংকটে ভোক্তাসাধারণ, সরকারি দামের তোয়াক্কা না করেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজার।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
প্রশাসনের নিরবতায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে এলপিজি

প্রশাসনের নিরবতায় এলপিজি সিলিন্ডারপ্রতি সরকারি দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা হলেও বাজারে বিক্রি ২ হাজার টাকা ছুঁইছুঁই। সরবরাহ কমেছে ৩০ হাজার টন। সিন্ডিকেট, এলসি জটিলতা ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে বিপর্যস্ত এলপিজি বাজার। জানুয়ারির নতুন মূল্য ঘোষণার আগেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে রান্নার এই জ্বালানির।

সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা বেশি দিয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন ভোক্তারা। কোথাও কোথাও অতিরিক্ত দাম দিয়েও মিলছে না এলপিজি। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে পাইপলাইন গ্যাসবিহীন লাখো পরিবার।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সর্বশেষ গেল বছর ২ ডিসেম্বর এলপিজির দাম সমন্বয় করে ১২ কেজির সিলিন্ডারের মূল্য নির্ধারণ করে ১ হাজার ২৫৩ টাকা। অথচ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বাজারে সেই সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার ৫০ টাকায়। এলাকাভেদে দামের এই তারতম্য এলপিজি বাজারে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই—এমন অভিযোগকে আরও জোরালো করছে। নতুন বছরের শুরুতে এলপিজির দাম বাড়বে কি কমবে— সে সিদ্ধান্ত জানা যাবে রবিবার। প্রশ্ন একটাই—দাম ঘোষণার পর বাজার কি সত্যিই নিয়ন্ত্রণে আসবে, নাকি সংকট আরও ঘনীভূত হবে?

দাম বাড়ছে নীরবে, কিন্তু সংকট প্রকাশ্যে। নগরীর আগ্রাবাদ, বাকলিয়া, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার কোথাও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না, আবার কোথাও মিললেও দাম আকাশচুম্বী। আগ্রাবাদের বাসিন্দা নাজমুল হাসান বলেন, ‘কয়েক দিন আগেও ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায় সিলিন্ডার পাওয়া যেত। এখন ২ হাজার টাকার কমে কেউ দিতে চায় না। গ্যাস নেই বলে এলপিজির ওপর নির্ভর করি, কিন্তু সেটাও এখন নাগালের বাইরে।’ একই অভিজ্ঞতার কথা জানান বাকলিয়ার বাসিন্দা অনামিকা বিশ্বাস। তিনি বলেন, ‘সরকারি দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা। পরিবহন মিলিয়ে সর্বোচ্চ ২০০ টাকা বেশি হতে পারে। অথচ আমাকে ২ হাজার টাকায় কিনতে হয়েছে।’

এলপিজি খাত সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি বিক্রি হয়ে থাকে। তবে গত ডিসেম্বরে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ৮৫ হাজার টনে। অর্থাৎ চাহিদা কমার কারণে নয়, বরং অন্তত ৩০ হাজার টনের বেশি সরবরাহ ঘাটতির কারণেই সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘাটতির সুযোগ নিয়েই খুচরা পর্যায়ে দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয়েছে। একাধিক এলাকায় প্রায় একই দামে সিলিন্ডার বিক্রি হওয়ায় বাজারে সিন্ডিকেটের অভিযোগও উঠেছে।

অপারেটরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ২০ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর ও ভারতের ৪৮ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জ্বালানি পরিবহনকারী জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই নেটওয়ার্কের বড় অংশ দক্ষিণ এশিয়ায় এলপিজি সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত ছিল। নিষেধাজ্ঞার পর সেই সরবরাহ চেইন কার্যত ভেঙে পড়েছে। নিষেধাজ্ঞা, এলসি জটিলতা ও আমদানি বন্ধ থাকায় সমস্যা বাড়ছে।

এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘শীত মৌসুমে চাহিদা বাড়ে। তার ওপর বেক্সিমকো, বসুন্ধরাসহ বড় কয়েকটি কোম্পানি এখন এলপিজি আমদানি করছে না। ঘাটতি পূরণে অন্য কোম্পানিগুলো আমদানি বাড়াতে চাইলেও অনুমতি মিলছে না।’

সরকারের পক্ষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, ‘বেশ কিছু কোম্পানি এলসি জটিলতার কারণে সময়মতো এলপিজি আমদানি করতে পারছে না। সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে নতুন বছরের শুরুতে এলপিজির দাম বাড়বে কি কমবে— সে সিদ্ধান্ত জানা যাবে আজ রবিবার। সৌদি আরামকোর জানুয়ারি মাসের কন্ট্রাক্ট প্রাইস অনুযায়ী এক মাসের জন্য নতুন দাম ঘোষণা করবে বিইআরসি। একই সঙ্গে অটোগ্যাসের নতুন দামও জানানো হবে। কারণ এলপিজি এখন দেশের লাখো পরিবারের একমাত্র রান্নার জ্বালানি। সেই জ্বালানির দাম যদি ঘোষণার বাইরে গিয়ে বাজারে নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে চাপ আরও বাড়বে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • এলপিজি

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন