সময় বাড়িয়ে, ব্যয় বাড়িয়ে, কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই ফেরত গেছে দুইশ কোটি টাকা। অথচ নগরবাসীর পানির তীব্র সংকট এখনো কাটেনি। প্রশ্ন রয়ে গেছে—দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া কীভাবে নিশ্চিত হবে চট্টগ্রামের পানির ভবিষ্যৎ?
প্রকল্প পরিচালক মাহবুবুল আলম জানান, “প্রকল্পের মূল কাজ শেষ হয়েছে। কিছু আইটেম বাদ পড়ায় প্রায় দুইশ কোটি টাকা ফেরত দিতে হয়েছে। এখন টেকনিক্যাল বিষয়গুলো ঠিকাদাররা দেখছেন, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাঁরা তদারকি করবেন।”
জানা যায়, চট্টগ্রামে বর্তমানে চারটি শোধনাগার মোহরা, কর্ণফুলী-১ ও ২, মদুনাঘাট মিলে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করে। নতুন ভান্ডালজুড়ি শোধনাগার এখনো নগরে পানি সরবরাহ শুরু করতে পারেনি। কর্ণফুলী নদীর তীরে রাঙ্গুনিয়া ও বোয়ালখালী উপজেলার জ্যৈষ্ঠপুরার ভান্ডালজুড়ি এলাকায় ৪১ একর জমির ওপর নির্মিত এই পানি শোধনাগার থেকে প্রতিদিন ছয় লাখ ঘনমিটার পানি সরবরাহের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এখান থেকে বোয়ালখালী, কর্ণফুলী, পটিয়া, ইপিজেডসহ শিল্পাঞ্চলে পানি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
২০১৬ সালের জানুয়ারিতে একনেক অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু ভূমি জটিলতায় তিন বছর দেরি হয়। পরে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৯৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা, যা প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৯৫৯ কোটি টাকা বেশি। অর্থায়ন করেছে কোরিয়ার এক্সিম ব্যাংক (৮২৪ কোটি ৫০ লাখ), বাংলাদেশ সরকার (১ হাজার ১৫০ কোটি ৬৫ লাখ) এবং চট্টগ্রাম ওয়াসা (২০ কোটি টাকা)। প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৩২ সালে চাহিদা হবে ৭০ থেকে ৮০ কোটি লিটার, ২০৪২ সালে ১২২ কোটি লিটার, ২০৫২ সালে ১৩৭ কোটি লিটার।
চট্টগ্রাম ওয়াসা এখন আরও একটি বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে—‘চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ উন্নয়ন’ নামের এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। এতে ৫৫টি গভীর নলকূপ, ৩৭০ কিলোমিটার পাইপলাইন ও ১ লাখ ডিজিটাল মিটার বসানো হবে। তবে শোধনাগারের জন্য কোনো বরাদ্দ বা মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) না থাকায় দাতা সংস্থাগুলো শোধনাগারে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বলেন, “নতুন একটি শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। মোহরা এলাকায় দিনে ২০ কোটি লিটার পরিশোধন সক্ষমতার একটি পানি শোধনাগার নির্মাণে ইডিসিএফের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হবে শিগগির।”
ওয়াসার নথি অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন পানির চাহিদা ৬০ থেকে ৬৫ কোটি লিটার, কিন্তু উৎপাদনের ৩০ শতাংশ সিস্টেম লসে হারিয়ে যায়। ফলে দিনে ২৫ থেকে ৩০ কোটি লিটার ঘাটতি থেকে যায়। চাহিদা ২০৩২ সালে পৌঁছাবে ৭০ থেকে ৮০ কোটি লিটারে, আর ২০৫২ সালে ১৩৭ কোটি লিটারে।
চুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সুদীপ কুমার পাল বলেন, “শুধু পাইপলাইন বসিয়ে পানি সংকট কমানো সম্ভব নয়। নতুন শোধনাগার নির্মাণ ও বিদ্যমানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।”
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু চট্টগ্রাম ওয়াসা এখনো রেশনিং পদ্ধতিতে পানি সরবরাহ করছে—শতাধিক এলাকায় এখনো লাইনই পৌঁছায়নি। নগরের উত্তর কাট্টলীতে সংযোগ পেলেও পানি পায়না। কেনা পানিতেই রান্না করতে বলে জানান বাসিন্দারা। দক্ষিণ পতেঙ্গার অভিজ্ঞতা আরও ভিন্ন, নগরের ওই এলাকায় ওয়াসার লাইনই যায়নি”।
জানা গেছে, ওয়াসা প্রথম পানি শোধনাগার নির্মাণ করে ১৯৮৬ সালে। হালদা নদীর পানি পরিশোধন করে সরবরাহের জন্য মোহরা পানি শোধনাগার চালু হয়, যার দৈনিক শোধনক্ষমতা ৯ কোটি লিটার। এরপর ২০১৬ সালে কর্ণফুলী পানি শোধনাগার-১ চালু হয়, যা দিনে ১৪ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করতে পারে। ২০১৮ সালে চালু হয় ৯ কোটি লিটার শোধনক্ষমতার মদুনাঘাট পানি শোধনাগার।
সর্বশেষ ২০২১ সালে চালু হয় কর্ণফুলী পানি শোধনাগার-২, এখান থেকেও দিনে ১৪ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব। চারটি শোধনাগার মিলিয়ে ওয়াসা প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫০ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করে। এর বাইরে চলতি বছর চার উপজেলার জন্য ভান্ডালজুড়ি পানি শোধনাগার চালু হয়েছে, তবে সেখান থেকে নগরে পানি সরবরাহ করা হয় না।
