মূল সংবাদে যান
অপরাধ

ভোজ্যতেলের ‘ডিও’ কারসাজি, স্লিপেই কোটি টাকার ব্যবসা!

খাতুনগঞ্জ শুধু চট্টগ্রামের নয়—বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্যের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার। এখানে দামের ওঠানামা মানে, প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় ভোক্তার হাহাকার।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
ভোজ্যতেলের ‘ডিও’ কারসাজি, স্লিপেই কোটি টাকার ব্যবসা!

সর্বশেষ পরিস্থিতি হলো—খাতুনগঞ্জে গত দুই সপ্তাহে পাম ও সয়াবিন তেলের দাম মণপ্রতি ১০০–১৫০ টাকা বেড়েছে। বলা হচ্ছে—আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং রেট বাড়ছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভেতরে চলছে ডিও স্লিপ কারসাজির পুরোনো খেলা। তেল নেই, স্লিপে কোটি টাকার ব্যবসা।

খাতুনগঞ্জের তেল বাণিজ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ডেলিভারি অর্ডার (ডিও) স্লিপ। এটি এমন এক ব্যবসা যেখানে “পণ্য না থাকলেও লাভ হয়, ডিও থাকলেই”। বিশেষ করে যখন বাজারে তেলের দাম বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়, তখন ডিও হাতে থাকা ব্যবসায়ীরা সময় মতো পণ্য ছাড়েন না। কখনো কোম্পানি ডিও বিক্রি করেই হাত গুটিয়ে নেয়, আবার কখনো ইচ্ছাকৃত বিলম্ব করে।

ফলাফল - ➡️ বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয় ➡️ পাইকারি দামে আগুন লাগে ➡️ এবং ভোক্তারা উচ্চমূল্যে তেল কিনতে বাধ্য হন।

দাম বাড়ার ‘যৌক্তিকতা’ না থাকলেও দাম বাড়ে কেন? তেল আমদানিকারকরা আন্তর্জাতিক বাজারের বুকিং রেট বাড়ার কথা বললেও, ভোক্তারা প্রশ্ন তোলেন— যে তেল মাসখানেক আগেই আমদানি হয়েছে, সেটার দাম হঠাৎ করে কেন বাড়বে?

এই প্রশ্নের জবাব নেই, কারণ বাজারের নিয়ন্ত্রণ গুটিকয়েক শিল্পগোষ্ঠীর হাতে। একটি অলিখিত সিন্ডিকেট যেন বাজারকে একরকম জিম্মি করে রেখেছে। একজন ব্যবসায়ী বলেই ফেলেন—“আমদানি মুক্ত করলেই দেখবেন দাম কমে যাবে।”

সরকার কোথায়? প্রশাসন কী করছে? কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) চট্টগ্রাম সভাপতি নাজের হোসাইন অভিযোগ করেন—

“প্রশাসনের অভিযান শুধু ‘অভিনয়’ নামমাত্র—জরিমানা, ক্যামেরা আর ফেসবুক পোস্টে শেষ। কিন্তু বাজারে কোনো প্রভাব পড়ে না।” নিয়মিত বাজার তদারকি নেই, সিন্ডিকেট ভাঙার চেষ্টা নেই, শাস্তির নজির নেই। এই সুযোগেই ব্যবসায়ীরা বারবার চক্রাকারে দর বাড়িয়ে নেয়—এ এক প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের সংস্কৃতি।

ভোক্তার পকেট কাটার রাজনীতি এই বাজারচালিত দুর্বল নীতির কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ভোক্তা। যেখানে সরকারের উচিত ছিল—ভোক্তা স্বার্থ রক্ষা, সেখানে দেখা যাচ্ছে ‘স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে কিছু গোষ্ঠীর’।

সরকার যেমন জ্বালানি বা চালের বাজারে শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করে, তেমনি

➡️ তেলের বাজারে ট্যারিফ অ্যাডজাস্টমেন্ট,

➡️ প্রতিযোগিতামূলক আমদানি নীতিমালা,

➡️ ডিও-স্লিপ লেনদেনে নিয়ম-কানুন তৈরি করতে পারত। কিন্তু তার কিছুই নেই।

এখন প্রয়োজন ডিও কারসাজির বিরুদ্ধে বাস্তব পদক্ষেপ- খাতুনগঞ্জের ভোজ্যতেল বাজারে এই ধাঁচের কারসাজি বছরের পর বছর চলে আসছে। এই ‘ডিও-তন্ত্র’ ভেঙে না ফেললে, তেলের দাম নিয়ন্ত্রণের কোনো বাস্তব সমাধান সম্ভব নয়।

সরকারের উচিত— ডিও স্লিপ বাণিজ্যকে নীতিগতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, সপ্তাহভিত্তিক আমদানি ও মজুদের তথ্য প্রকাশ করা, বাজার মনিটরিংয়ে জেলা প্রশাসন ও টাস্কফোর্সকে স্থায়ীভাবে যুক্ত করা, তেল আমদানিতে নতুন খাত ও উৎস উন্মুক্ত করা।

সম্ভাব্য সমাধান -

✅ ভোজ্যতেল আমদানিতে প্রতিযোগিতা উন্মুক্ত করা – গুটিকয়েক গোষ্ঠীর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভাঙবে।

✅ ডিও বাণিজ্যের ওপর আইনগত বিধি ও নজরদারি – অনিয়ন্ত্রিত বিক্রি রোধে কাঠামোগত সংস্কার।

✅ ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষের কার্যকর বাজার পর্যবেক্ষণ – জরিমানা নয়, নিয়মিত হস্তক্ষেপ দরকার।

✅ স্টক রিপোর্টিং বাধ্যতামূলক করা – কোন কোম্পানির কত তেল মজুদ, তা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • ভোজ্যতেল
  • ডিও
  • খাতুনগঞ্জ
  • ক্যাব
  • বাজার মনিটরিং

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন