মূল সংবাদে যান
শিক্ষা ও চিকিৎসা

চবিতে সংঘর্ষ: উপ-উপাচার্যসহ আহত ১৮০, সব পরীক্ষা স্থগিত, ১৪৪ ধারা জারি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে দুই দফা সংঘর্ষে এক সহ-উপাচার্যসহ অন্তত ১৮০ জন আহত হয়েছেন। গুরুতর আহতদের মধ্যে প্রায় ৬০ শিক্ষার্থীকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
চবিতে সংঘর্ষ: উপ-উপাচার্যসহ আহত ১৮০, সব পরীক্ষা স্থগিত, ১৪৪ ধারা জারি

ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রবিবারের সব পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেছে। ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

১৪৪ ধারা জারিতে সেনা ও পুলিশ সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন। গত শনিবার (৩০ আগস্ট) রাত থেকে শুরু হওয়া এই সহিংসতার সূত্রপাত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে তার বাসার দারোয়ানের মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ওই ঘটনায় প্রতিবাদ জানাতে গেলে শিক্ষার্থীদের ওপর স্থানীয়রা হামলা চালায়। প্রথম দফার সংঘর্ষে অন্তত ৭০ জন শিক্ষার্থী আহত হন।

রবিবার (৩১ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২ নম্বর গেট এলাকায় ফের সংঘর্ষ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যায়। এ সময় ইটপাটকেলের আঘাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মো. কামাল উদ্দিনসহ অন্তত ১১০ জন শিক্ষার্থী আহত হন।

চমেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করে আহত শিক্ষার্থীদের একে একে আনা হচ্ছে। কারও মাথায়, কারও হাতে ব্যান্ডেজ; কেউ আবার স্ট্রেচারে বা সহপাঠীদের কাঁধে ভর দিয়ে হাসপাতালে ঢুকছেন।

রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের আহত শিক্ষার্থী রিয়াদ আহমেদ বলেন, “দেশি অস্ত্র নিয়ে স্থানীয় লোকজন শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করেছেন। কিছু ভবনে এখনো শিক্ষার্থীদের আটকে রাখা হয়েছে। সেখানে পুলিশ নীরব ভূমিকায় ছিল।”

স্থানীয়দের দাবি, তাদেরও অন্তত ১০ থেকে ১৫ জন বাসিন্দা এ সংঘর্ষে আহত হয়েছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, দুই দিনে আহতের সংখ্যা ১৮০ ছাড়িয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ২ নম্বর গেট এলাকায় এক নারী শিক্ষার্থীকে বাসার দারোয়ান কর্তৃক মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের ভয়াবহ সংঘর্ষে অন্তত অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।

গত শনিবার রাত সাড়ে ১১টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত দফায় দফায় চলা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপে আহতদের মধ্যে গুরুতর অন্তত ২০ জনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। সংঘর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির দুই শিক্ষকও আহত হন।

ঘটনার সূচনায় প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী সাফিয়া খাতুন গত শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে তাঁর ভাড়া বাসায় ফিরলে দারোয়ান গেট খুলতে অস্বীকৃতি জানান। পরে গেট খোলার পর তাঁকে থাপ্পড় ও ধাক্কা দেন দারোয়ান।

ছাত্রীটি সহপাঠীদের ডেকে আনলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং দারোয়ানকে ধরতে গেলে সে পালিয়ে যায়। এ সময় স্থানীয়রা একত্রিত হয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ শুরু করলে সংঘর্ষ বাঁধে।

ভুক্তভোগী সাফিয়া বলেন, “গেট বন্ধ থাকায় অনেকবার ধাক্কা দিয়েছি, রুমমেটরা অনুরোধ করেছে। গেট খোলার পর দারোয়ান আমাকে লাথি-থাপ্পড় মারে। আমার প্রতি অমানবিক ব্যবহার করেছে।”

শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, স্থানীয়রা মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে তাঁদের ওপর হামলা চালান। দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তারা শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে। সংঘর্ষে পুলিশের দুটি গাড়ি, নিরাপত্তা বাহিনীর একটি গাড়ি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।

চবির মেডিকেল সেন্টারের সিনিয়র মেডিকেল অফিসার ডা. মো. টিপু সুলতান জানান, আনুমানিক ১০০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। তিনি বলেন, “আমি আগে কখনো একই সঙ্গে এত শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে আসতে দেখিনি।”

প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও স্থানীয়দের নিয়ন্ত্রণে থাকায় পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেননি জানিয়ে শিক্ষার্থীরা সমালোচনা করে বলেন, “আমাদের ভাইয়েরা একের পর এক আহত হচ্ছে, আর প্রশাসন শুধু ফেসবুকে সাহায্য চাইছে।

প্রথমে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। পরে রাত সাড়ে ৩টার দিকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত হয়ে আটকে থাকা শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করেন। ভোর ৫টার দিকে সেনা কর্মকর্তা মেজর শাহরিয়ার বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছি। সকালে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে।”

রবিবার ভোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন সকল পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীদের ওপর এ হামলার ঘটনায় বহুজন আহত হয়েছেন। তাঁদের অনেকের পরীক্ষা ছিল। তাই আজকের সব পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।”

চবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. তানভির হায়দার বলেন, “এ ধরনের ঘটনা দুঃখজনক। সেনাবাহিনী ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছি। যারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

চবি এলাকার ২ নম্বর গেইট বাজার থেকে পূর্বদিকে রেলগেইট পর্যন্ত সড়কের উভয় পাশে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। রবিবার (৩১ আগস্ট) দুপুর ২টা থেকে আগামীকাল সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) রাত ১২টা পর্যন্ত এ আদেশ কার্যকর থাকবে।

হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মুমিন স্বাক্ষরিত আদেশে জানানো হয়, শনিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে ২ নম্বর গেইট এলাকায় মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

বর্তমানে পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক অবস্থায় থাকায় জননিরাপত্তা ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে এই আদেশ জারি করা হয়েছে। আদেশে আরও বলা হয়, এই সময়ে উল্লিখিত এলাকায় পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তি একত্রিত হওয়া, সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ, মিছিল, গণজমায়েত, বিস্ফোরক দ্রব্য বা আগ্নেয়াস্ত্র বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখখা যায়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দ্বন্দ্ব নতুন নয়। ক্যাম্পাস ঘেঁষা গ্রামগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে। আবাসন সমস্যা, দারোয়ান ও ভাড়াটেদের মধ্যে বিরোধ, স্থানীয় দোকান-পরিসেবার নিয়ন্ত্রণ এবং ছাত্ররাজনীতির প্রভাব—এসব মিলেই পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বারবার সংঘর্ষ ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন, অন্যদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ—শিক্ষার্থীদের একটি অংশ সুযোগ পেলেই দাপট দেখায় এবং ভাঙচুরে জড়ায়। দুই পক্ষের অবিশ্বাসই প্রতিবার সংঘাতকে আরও সহিংস রূপ দিচ্ছে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • চবি
  • সংঘর্ষ

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন