এক বছরে পাসের হার কমেছে প্রায় ১৩ শতাংশীয় পয়েন্ট। শুধু পাসের হার নয়, কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও।
এবার ৫২ হাজার ৭৫৬ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। এর মধ্যে শুধু একটি বিষয়ে ফেল করেছে ২৮ হাজার ৭৭১ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ২২ দশমিক ০৯ শতাংশ।
গতকাল সোমবার সকালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলে এ চিত্র পাওয়া গেছে। বোর্ডের অধীনে এবার পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জনের মধ্যে পাস করেছে ৭৭ হাজার ৪৫৩ জন।
গত বছর পাস করেছিল ১ লাখ ১ হাজার ১৮১ জন। ফলে এক বছরের ব্যবধানে পাস করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে প্রায় ২৪ হাজার। এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে ৯ হাজার ৩৯৮ জন শিক্ষার্থী। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৮৪৩ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২ হাজার ৪৪৫ জন।
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের গত ১৫ বছরের ফলাফল বিশ্লেষণে এবারের বিপর্যয়ের মাত্রা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কোনো বছরই বোর্ডের পাসের হার ৭৫ শতাংশের নিচে নামেনি। ২০১১ সালে পাসের হার ছিল ৭৮ দশমিক ৩৬ শতাংশ। ২০১৩ সালে তা বেড়ে ৮৮ দশমিক ০৭ শতাংশ এবং ২০১৪ সালে ৯১ দশমিক ৪২ শতাংশে পৌঁছায়। এরপর কয়েক বছর ওঠানামার মধ্য দিয়ে ২০২১ সালে বোর্ডের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ৯১ দশমিক ১৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করে। কিন্তু এরপর থেকেই সামগ্রিক ফলাফলে নিম্নমুখী প্রবণতা স্পষ্ট হয়।
২০২২ সালে পাসের হার ৮৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৭৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, ২০২৪ সালে সামান্য বেড়ে ৮২ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৭২ দশমিক ০৭ শতাংশে। এবার আরও বড় পতনে পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশে। অর্থাৎ ২০২১ সালের রেকর্ড পাসের হারের তুলনায় মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে কমেছে ৩১ দশমিক ৬৫ শতাংশীয় পয়েন্ট।
বিভাগভিত্তিক ফলাফলেও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে। সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা। এ বিভাগে এবার পাসের হার মাত্র ৩৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৫৫ দশমিক ০২ শতাংশ। ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে পাসের হার ৬০ দশমিক ১২ শতাংশ, গত বছর যা ছিল ৭৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ। আর বিজ্ঞান বিভাগে এবার পাসের হার ৮৪ দশমিক ৪১ শতাংশ; গত বছর ছিল ৯২ দশমিক ৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ তিন বিভাগেই পাসের হার কমেছে। তবে সবচেয়ে বড় পতন মানবিক বিভাগে—এক বছরে কমেছে ১৬ দশমিক ২৩ শতাংশীয় পয়েন্ট।
চট্টগ্রাম মহানগরে এবার পাসের হার ৭৪ শতাংশ। গত বছর এ হার ছিল ৮১ দশমিক ০৩ শতাংশ। মহানগর বাদে চট্টগ্রাম জেলায় পাসের হার ৫৭ দশমিক ১৩ শতাংশ, গত বছর যা ছিল ৭১ দশমিক ২৯ শতাংশ। বোর্ডের অধীন পার্বত্য ও উপকূলীয় জেলাগুলোতেও ফলাফল হয়েছে আরও হতাশাজনক।
কক্সবাজারে এবার পাসের হার ৫৭ দশমিক ৩০ শতাংশ, গত বছর ছিল ৭০ দশমিক ৭৬ শতাংশ। রাঙামাটিতে পাসের হার ৪১ দশমিক ১৭ শতাংশ, গত বছর ছিল ৫৬ দশমিক ৫৫ শতাংশ। খাগড়াছড়িতে মাত্র ৩৪ দশমিক ৯৯ শতাংশ, গত বছর ছিল ৬০ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আর বান্দরবানে এবার পাস করেছে ৪৭ দশমিক ৮৮ শতাংশ, গত বছর ছিল ৬৩ দশমিক ১২ শতাংশ।
এবারের ফল বিপর্যয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো একক বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা। বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৮ হাজার ৭৭১ জন শুধু একটি বিষয়ে ফেল করেছে। অর্থাৎ মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় প্রতি পাঁচজনে একজন মাত্র একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে। বোর্ড কর্তৃপক্ষের মতে, এক বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীর বিপুল সংখ্যাই সামগ্রিক পাসের হার কমে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
পাসের হারের পাশাপাশি জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। ২০২১ সালে চট্টগ্রাম বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১২ হাজার ৭৯৫ জন। ২০২২ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ হাজার ৬৬৪ জনে। এরপর তা কমতে থাকে—২০২৩ সালে ১১ হাজার ৪৫০, ২০২৪ সালে ১০ হাজার ৮২৩ এবং ২০২৫ সালে ১১ হাজার ৮৪৩ জন।
এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৯ হাজার ৩৯৮ জন, যা গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২২ সালের সর্বোচ্চ সংখ্যার তুলনায় এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৯ হাজার ২৬৬ জন—অর্থাৎ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
বিদ্যালয়ভিত্তিক ফলাফলও এবার আগের বছরের তুলনায় খারাপ হয়েছে। এবার আটটি বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি। গত বছর এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র একটি। অন্যদিকে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যাও কমেছে।
এবার ২১টি বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থী পাস করেছে, গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩৩টি। এবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৮২ জন। পরীক্ষায় উপস্থিত ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৯ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৫৬ হাজার ৩২৫ জন এবং ছাত্রী ৭৪ হাজার ৩৪৩ জন। ছাত্রদের পাসের হার ৫৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং ছাত্রীদের ৬০ দশমিক ০৩ শতাংশ।
ফলাফলের সামগ্রিক চিত্র বলছে, ২০২১ সালের রেকর্ড সাফল্যের পর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এসএসসি ফলাফলে যে নিম্নমুখী প্রবণতা শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালের ফলাফল তা ভয়াবহ মাত্রায় নিয়ে গেছে। পাসের হার ৬০ শতাংশের নিচে নেমে আসা, অর্ধলক্ষাধিক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া, মানবিক বিভাগে ৪০ শতাংশের নিচে পাস এবং আট বিদ্যালয়ে শূন্য পাস—সব মিলিয়ে এবারের ফলাফলকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগত সংকট হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
