শনিবার সকাল ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে সিনেটের অধিবেশন শুরু হয়ে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে। বর্তমানে নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধি রয়েছেন ২৪ জন। তাঁদের কেউই অধিবেশনে অংশ নেননি। তবে তাঁদের বেশির ভাগই আওয়ামী ও বামপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন মুক্তিযুদ্ধে উদ্বুদ্ধ প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজের (হলুদ দল) রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি ও চাকসুর নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, এসব শিক্ষক আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত। আওয়ামীপন্থী কোনো শিক্ষককে সিনেটে রাখা যাবে না—এমন দাবিতে তাঁরা কর্মসূচি পালন করেন। তাঁদের হুঁশিয়ারি, আওয়ামীপন্থী কোনো শিক্ষক সিনেটে যোগ দিলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
নিরাপত্তার অভাবে যাননি শিক্ষকরা
সিনেট অধিবেশনে না যাওয়া শিক্ষকদের একজন সমাজতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এস এম মনিরুল হাসান। তিনি বলেন, প্রায় ২০ জন শিক্ষক ক্যাম্পাসে উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু একজন নির্বাচিত সদস্য কেন সিনেট সভায় যোগ দিতে পারবেন না, সেটিই তাঁদের প্রশ্ন।
বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. দানেশ মিয়া বলেন, সিনেট সভায় অংশ নেওয়ার মতো পরিবেশ ছিল না। সিনেট কর্তৃপক্ষ তাঁদের নিরাপত্তা দিতে পারেনি। ২০১৫ সালের সিনেট নির্বাচনে নির্বাচিত শিক্ষকদের সবাই এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে আছেন বলেও জানান তিনি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে শিক্ষক প্রতিনিধিদের সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল। মৃত্যু ও অবসরের কারণে বর্তমানে শিক্ষক প্রতিনিধির ৯টি পদ শূন্য রয়েছে। বাকি ২৪ জনেরই শনিবারের অধিবেশনে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তাঁদের মধ্যে অন্তত ২০ জন ক্যাম্পাসে এলেও কেউ অধিবেশনস্থলে যাননি।
সিনেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্ষদ
বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পর্ষদ সিনেটে বার্ষিক প্রতিবেদন, আয়-ব্যয়ের হিসাব, আর্থিক প্রাক্কলনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা ও অনুমোদন করা হয়। প্রতিবছর অন্তত একবার সিনেটের অধিবেশন হওয়ার কথা থাকলেও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর গত দুই বছরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো সিনেট অধিবেশন হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে ১২টি ক্যাটাগরিতে মোট ১০২ সদস্যের পদ রয়েছে। এর মধ্যে উপাচার্য, দুই সহ-উপাচার্য, সরকার মনোনীত পাঁচ কর্মকর্তা, জাতীয় সংসদের স্পিকার মনোনীত পাঁচ সংসদ সদস্য, আচার্য মনোনীত পাঁচ শিক্ষাবিদ, সিন্ডিকেট মনোনীত গবেষণা সংস্থার পাঁচ প্রতিনিধি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দ্বারা নির্বাচিত ৩৩ জন শিক্ষক প্রতিনিধি রয়েছেন।
১৯ দফা দাবিতে চাকসুর বর্জন
সিনেট অধিবেশন প্রত্যাখ্যান করে উপাচার্যের কাছে ১৯ দফা দাবিসংবলিত খোলাচিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু)। শনিবার সকাল ১১টায় চাকসু ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলনে ভিপি মো. ইব্রাহীম চিঠিটি পাঠ করেন।
চাকসুর অভিযোগ, সিনেটে শিক্ষার্থীদের পাঁচজন নির্বাচিত প্রতিনিধি থাকার কথা থাকলেও নির্বাচন না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে বর্তমান সিনেটে জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গণহত্যার পক্ষে মৌন মিছিল করা শিক্ষক রয়েছেন—এমন অভিযোগ তুলে তারা অধিবেশন প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেয়।
চাকসুর ১৯ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে নতুন হল নির্মাণ, বিদ্যমান হল সংস্কার, আবাসন সক্ষমতা ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি, ৩ হাজার শিক্ষার্থীকে আবাসন ভাতা, নতুন শাটল ট্রেন ও বগি সংযোজন এবং শহরগামী অন্তত ১০টি বাস চালু করা।
‘আওয়ামী লীগের ঠিকানা সিনেটে হবে না’
এদিকে ‘আওয়ামী লীগের ঠিকানা সিনেটে হবে না, স্বৈরাচারের ঠিকানা সিনেটে হবে না’—এমন স্লোগানে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদল।
শনিবার সকাল ১০টার দিকে শুরু হওয়া কর্মসূচিতে শাখা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল নোমানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। একপর্যায়ে ছাত্রদলের নেতারা উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
সাক্ষাৎ শেষে আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, আওয়ামী লীগের কোনো শিক্ষক সিনেট অধিবেশনে থাকতে পারবেন না। কেউ সিনেটে আমন্ত্রণ পেলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
একই দাবিতে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করে ছাত্রশিবির ও জাতীয় ছাত্রশক্তি। সকাল ১০টার দিকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে ছাত্রশক্তির কর্মসূচি শুরু হয়। পরে বেলা ১টার দিকে শহীদ মিনারের সামনে বিক্ষোভ করে ছাত্রশিবির।
জাতীয় ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক মো. ইসমাইল বলেন, ফ্যাসিবাদের দোসররা যেন সিনেট সভায় অংশ নিতে না পারেন, সে দাবিতে তাঁরা অবস্থান নিয়েছেন।
উপাচার্য বললেন, ‘না আসাটা তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত’
সিনেট অধিবেশনে শিক্ষক প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতির বিষয়ে উপাচার্য মোহাম্মদ আল-ফোরকান বলেন, তাঁদের সিনেটে আসতে নিষেধ করা হয়নি। সিনেটে অংশ নেওয়া তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার। সিনেটের সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। না আসাটা তাঁদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, সিনেট সভা শান্তিপূর্ণভাবেই সম্পন্ন হয়েছে। সকালে কিছুটা সংশয় দেখা দিলেও বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীরা দাবি নিয়ে আসার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
উপাচার্য আরও বলেন, সিনেটে বর্তমানে নির্বাচিত সদস্যদের অনেকেই পদ ছেড়ে সরে যেতে চাইছেন। ধারাবাহিকভাবে সিনেটের সব পর্যায়ের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলেও তিনি জানান।