এরই অংশ হিসেবে আগামী ২০ জুলাই মাধ্যমিক ও সমমানের (এসএসসি) পরীক্ষার ফল প্রকাশের পাশাপাশি মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় নতুন নজরদারি ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে|
মঙ্গলবার (২৩ জুন) চট্টগ্রাম কলেজ অডিটোরিয়ামে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান চিত্র, চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন|
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ‘এক ছাতার নিচে’ পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে| তাঁর মতে, শিক্ষার ক্ষেত্রে অঞ্চলভেদে বা বোর্ডভেদে কোনো ধরনের ˆবষম্য থাকা উচিত নয়| অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা আয়োজন সেই বৃহৎ পরিকল্পনার প্রথম ধাপ|
শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বর্তমানে সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন বোর্ড ও অঞ্চলে পরিচালনাগত কিছু পার্থক্য রয়েছে| এসব ˆবষম্য দূর করতে পারলে শিক্ষার মান ও মূল্যায়নে সমতা প্রতিষ্ঠা সহজ হবে|
শিক্ষামন্ত্রী জানান, চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল আগামী ২০ জুলাই প্রকাশ করা হবে| প্রতি বছর ফল প্রকাশের সময় পরীক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়| এবারের ফল প্রকাশের আগে মূল্যায়ন পদ্ধতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি|
পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে সব শিক্ষা বোর্ডের উত্তরপত্র র্যান্ডমভাবে যাচাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়| শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সব বোর্ডের খাতা আমরা রেন্ডমলি চেক করে দেখবো, কেউ কম বা বেশি ন¤^র দিয়ে দিলো কিনা|
শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, উত্তরপত্র মূল্যায়নে মানবিক ভুল বা অসঙ্গতি কমাতে এ ধরনের অডিটিং পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে| এতে বোর্ডগুলোর মধ্যে মূল্যায়নের মানদণ্ডেও সামঞ্জস্য আসবে|
প্রশ্নফাঁস প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, একসময় দেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নফাঁস বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছিল| বিশেষ করে ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে| প্রশ্নফাঁস চক্র ভাঙতে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে|
তিনি বলেন, প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে তিনি নিজেও বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট প্রেস (বিজি প্রেস) পরিদর্শন করেছেন এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছেন| প্রশ্নফাঁস চক্র ভাঙতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে কাজ করছে| আমরা নকল শব্দটির কবর দিয়েছি অনেক আগেই| কিন্তু এখন নকল হচ্ছে ডিজিটালি| সেটাকে সেভাবেই প্রতিহত করতে হবে|
উপস্থিত বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট ডিভাইস এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে পরীক্ষায় অনিয়মের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে| ফলে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি হয়ে উঠেছে|
পরীক্ষাকেন্দ্রের সংকট ও দূরবর্তী এলাকার শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকার প্রতি চারটি ইউনিয়নের জন্য একটি পৃথক পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপনের চিন্তা করছে| গ্রামীণ অঞ্চলে অনেক শিক্ষার্থীকে কয়েক কিলোমিটার দূরে গিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়| নতুন কেন্দ্র স্থাপিত হলে যাতায়াত ব্যয় ও সময় কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা|
মতবিনিময় সভায় পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা প্রশাসন নিয়েও কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী| তিনি উল্লেখ করেন, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ এবং কিছু ক্ষেত্রে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের নিয়োগ পার্বত্য জেলা পরিষদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়| শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এ ব্যবস্থাকে তিনি "এক দেশের ভেতরে আরেক দেশ" হিসেবে উল্লেখ করেন|
তার মতে, শিক্ষা খাতে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নে সমš^য় নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনিক বিভাজন কমাতে হবে| দেশে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন শিক্ষামন্ত্রী| তিনি বলেন, সবাই অনার্স কোর্স চালু করতে চায়, কিন্তু কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষার দিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না|
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং বিভিন্ন শ্রমবাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিল্পখাতে দক্ষ জনবলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে| অথচ উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও বাড়ছে| ফলে শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের চাহিদার সমš^য় এখন সময়ের দাবি|
সভায় বিশেষ অতিথি ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, শিক্ষার হার বাড়লেও মানোন্নয়ন প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি| তার মতে, ˆনতিক ও মানবিক শিক্ষার ঘাটতির কারণে সমাজে কিশোর গ্যাং, সহিংসতা, দুর্নীতি ও সামাজিক অবক্ষয়ের মতো সমস্যা বাড়ছে|
তিনি বলেন, আগামী প্রজন্মকে শুধু শিক্ষিত নয়, আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং সেই প্রক্রিয়া শুরু হওয়া উচিত প্রাথমিক স্তর থেকেই|
প্রশ্নোত্তর পর্বে শিক্ষাবিদরা বলছেন, অভিন্ন প্রশ্নপত্র, মূল্যায়নে ¯^চ্ছতা, প্রশ্নফাঁস প্রতিরোধ এবং প্রশাসনিক সমš^য়—এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে|
তবে একই সঙ্গে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অনিয়ম মোকাবিলাও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে| এসএসসি ফল প্রকাশের প্রাক্কালে শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষিত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের কিছু কাঠামোগত সমস্যার সমাধানের পথ খুলে যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা|
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর আব্দুল্লাহ আল মামুনের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম ৮ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এরশাদ উল্লাহ, চট্টগ্রাম ৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবু সুফিয়ান, চট্টগ্রাম ১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. জিয়াউদ্দিন, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহেদুল ইসলাম মিঞাসহ আরও অনেকে|
