বিশ্ববিদ্যালয়ে কী অর্জন করলে—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সেই অর্জন দিয়ে আমরা সমাজের জন্য কী করব।
গতকাল সোমবার সকালে নগরের টাইগারপাসের একটি কনভেনশন সেন্টারে চিটাগং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির (সিআইইউ) তৃতীয় সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার (সিআর আবরার) এসব কথা বলেন।
শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, স্নাতকোত্তর শেষে শিক্ষার্থীরা জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে, যেখানে প্রতিনিয়ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেই সিদ্ধান্ত যেন হয় সুবিবেচনাপূর্ণ, সে জন্য সময় নিয়ে ভাবতে হবে। যুক্তি ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এমনকি একজন সামান্য কর্মীকেও যদি চাকরি থেকে বরখাস্ত করতে হয়, সেখানেও মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও সুবিচার নিশ্চিত করা জরুরি। কেবল প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ দেখলেই চলবে না; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার ও ন্যায়সংগত দিকটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। সমাজে ক্ষমতা ও দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষা করাই প্রকৃত শিক্ষার পরিচয়।
সিআর আবরার বলেন, দেশ বর্তমানে একটি বড় ধরনের রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ সময় আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায়, কোন পথে আমরা এগোব। অতীতের যে ব্যবস্থা আমাদের নানা সংকট ও বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে, আমরা কি আবার সেই পথেই ফিরব, নাকি নতুন ও ন্যায্য একটি ব্যবস্থার দিকে যাব—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। শুধু ব্যক্তি আকাঙ্ক্ষা পূরণ নয়, বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্বও বিবেচনায় নিতে হবে। ন্যায়নীতি, সহনশীলতা, সহমর্মিতা ও বৈচিত্র্েযর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াই একটি সভ্য সমাজের ভিত্তি। ব্যক্তি অর্জন দিয়ে জীবনের সাফল্য মাপা যায় না; বরং সমাজের জন্য আমরা কী দিচ্ছি— সেটাই প্রকৃত মাপকাঠি।
সমাবর্তন বক্তা হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে ব্র্যাকের চেয়ারম্যান, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী সভাপতি ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, স্নাতক ডিগ্রি কোনো পুরস্কার নয়, বরং এটি একটি প্রতিশ্রুতি—যার মাধ্যমে নতুন দরজা ও সম্ভাবনার পথ খুলে যায়। তবে শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ হয় না; বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার সমন্বয়ই শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নেবে।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব হার্ড স্কিল ও সফট স্কিলের সমন্বয়ে পরিচালিত। তাই শিক্ষার্থীদের শুধু শিক্ষিত নয়, দক্ষ মানুষ হিসেবেও নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। দক্ষতার ক্ষেত্র প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। নিজের যোগ্যতা ও আগ্রহ চিহ্নিত করে প্রস্তুত থাকাই ভবিষ্যৎ সাফল্যের চাবিকাঠি। অনিশ্চয়তা ভয় পাওয়ার বিষয় নয়; বরং প্রস্তুত থাকা, সুযোগ শনাক্ত করা এবং ব্যর্থতার পর নতুন করে শুরু করার শক্তি অর্জনের নামই অনিশ্চয়তা গ্রহণ। জীবনে সক্রিয় ও উদ্যোগী হওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। প্রত্যেককেই ঠিক করতে হবে—তিনি নিজের জীবনের চালক হবেন, নাকি কেবল একজন যাত্রী।
সিআইইউর উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীর মোহাম্মদ নুরুল আবসার বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; বরং নৈতিকতা, মানবিকতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের কেন্দ্র। এয়াড়া সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিআইইউ ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান লুৎফে এম আইয়ুব, প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্ট ইএসটিসিডির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাকারিয়া খান এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনসহ বিশিষ্টজনেরা।
