এ নিয়ে চলতি বছর জেলার ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৯ জনে, মৃত্যু ১৪ জন। অন্যদিকে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৯০০ জন—যার প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি-আগস্টে ডেঙ্গু রোগী ছিল ৫৬৬ জন, মৃত্যু ৬ জন। অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ১৪৫ জন এবং মৃত্যু ১৪ জন—অর্থাৎ রোগী বেড়েছে প্রায় ১০১ শতাংশ, এবং মৃত্যু বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ।
মাসওয়ারি পরিসংখ্যান বলছে— ডেঙ্গু সংক্রমণ মে মাস থেকে দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। মে ২০২৫-এ ১১৬ জন (২০২৪ সালের তুলনায় ৬ গুণ বৃদ্ধি), জুন ২০২৫-এ ১৭৬ জন (২০২৪ সালের তুলনায় ৩ গুণের বেশি বৃদ্ধি), জুলাই ২০২৪: ১৯৮ জন আক্রান্তের বিপরীতে ১ জনের মৃত্যু, জুলাই ২০২৫: ৪৩০ জন আক্রান্তের বিপরীতে ৭ জনের মৃত্যু (২০২৪ সালের তুলনায় বৃদ্ধি ১১৭ শতাংশ ও মৃত্যু সাত গুণ), আগস্ট ২০২৪ (পুরো মাস): ২০২ জন আক্রান্তের বিপরীতে ১ জনের মৃত্যু, আগস্ট ২০২৫ (১৪ দিনে): ২৭০ জন আক্রান্তের বিপরীতে ৫ জনের মৃত্যু।
চট্টগ্রামে ডেঙ্গু সংক্রমণ শুধু নগরে সীমাবদ্ধ নয়, বরং গ্রামীণ এলাকাতেও দ্রুত ছড়াচ্ছে। এ বছর জেলার ৫৬৪ জন আক্রান্তের মধ্যে— সীতাকুণ্ড: ১৭২ জন, বাঁশখালী: ১৩০ জন, লোহাগাড়া ও আনোয়ারা: ৪৭ জন করে, সাতকানিয়া: ৩৯ জন, রাউজান: ২৮ জন, কর্ণফুলি: ১৮ জন, হাটহাজারী: ১৬ জন, পটিয়া: ১৪ জন, মীরসরাই: ১২ জন, চন্দনাইশ: ১১ জন, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ি: ৮ জন করে এবং বোয়ালখালী ও সন্দ্বীপ: ৭ জন করে। চিকুনগুনিয়া যেন লুকানো এক মহামারি। চিকুনগুনিয়ার সরকারি পরিসংখ্যান ডেঙ্গুর মতো নিয়মিত হালনাগাদ না হলেও, বেসরকারি ল্যাবের তথ্যে গত দুই সপ্তাহেই চট্টগ্রামে ১ হাজারের বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯০০ জনে।
তবে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রকৃত সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি, কারণ পরীক্ষার উচ্চ ব্যয় (৪ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত) দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত রোগীদের পরীক্ষা থেকে বিরত রাখছে। সরকারি হাসপাতালে এখনো এই পরীক্ষার ব্যবস্থা হয়নি। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি ও চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা যায় টেস্ট কিট সংকট। ২৮ জুলাই সিভিল সার্জনের চিঠিতে সরকারি হাসপাতালে র্যাপিড টেস্ট কিট সরবরাহের অনুরোধ জানানো হলেও এখনো সাড়া মেলেনি। ফলে প্রাথমিক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা হিসেবে বর্ষার শুরুতেই মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ না নেওয়ায় সংক্রমণ বেড়েছে।
উচ্চ ঝুঁকির এলাকা হিসেবে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) জরিপে চট্টেশ্বরী রোড, ও আর নিজাম রোড, আগ্রাবাদ, পাহাড়তলী, হালিশহর ও ঝাউতলাকে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আইইডিসিআরের সুপারিশে রোগীর লক্ষণ অনুযায়ী দ্রুত চিকিৎসা প্রদান, উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে মশা নিয়ন্ত্রণ, সিটি কর্পোরেশনের সব ওয়ার্ডে পর্যায়ক্রমে এই কার্যক্রম বিস্তৃত করা এবং জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত কররত হবে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আব্দুর রব বলেন— “জুলাই-আগস্টের এই ঊর্ধ্বগতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম যথেষ্ট কার্যকর হয়নি। বর্ষার শুরুতেই যদি মশা নিয়ন্ত্রণে আনা যেত, পরিস্থিতি কিছুটা হলেও ভালো হতো। এদিকে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, আগস্ট-সেপ্টেম্বরের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এ বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি ২০২৩ সালের রেকর্ড (১৪ হাজার ৮৭ জন আক্রান্ত, ১০৭ জন মৃত্যু) ছাড়িয়ে যেতে পারে।
সরেজমিনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের মেডিসিন বহির্বিভাগে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসা নিতে আসা বেশিরভাগই জ্বরের রোগী। এদের মধ্যে কয়েকজন এসেছেন স্ট্রেচারে ভর করে। এদের একজন পটিয়ার বাসিন্দা আবুল হাশেম। জানতে চাইলে তিনি বলেন, গত চারদিন ধরে তীব্র জ্বরে ভুগছেন, সাথে হাত পা ও শরীরে বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা। তাই ডাক্তারকে দেখাতে এসেছি।
অপরদিকে নগরীর হালিশহর এলাকার বাসিন্দা ফৌজিয়া সুলতানা বলেন, ডেঙ্গু পরীক্ষা করিয়েছিলাম, সেখানে রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। এখন জ্বর নাই। কিন্তু শরীর ব্যথার কারণে রাতে ঘুমাতে পারছি না। এই রকম ব্যথা আর কখনো অনুভব করিনি। অনেকে বলেছেনুআমার চিকুনগুনিয়া হতে পারে। শুনেছি চিকুনগুনিয়া পরীক্ষা করাতে সাড়ে ৪ হাজার টাকা লাগবে। এখন এত টাকা দিয়ে পরীক্ষা করানোর মতো আর্থিক অবস্থা আমাদের নাই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের জ্বর থাকলেও সর্দি কাশি থাকে না। রোগীদের গায়ে ব্যথা থাকে। গায়ে ফুসকুড়ি (র্যাশ) থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে। শরীরে তীব্র ব্যথা থাকে। ব্যথার মাত্রা এত বেশি থাকে যে রোগী হাঁটতে পারেন না। চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যুঝুঁকি কম, কষ্ট বেশি। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৭০ শতাংশ এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে যান। ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে রোগী তিন মাস পর্যন্ত অসুস্থ থাকতে পারেন, গায়ে ব্যথা থাকতে পারে। ৫ থেকে ৭ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে সুস্থ হতে বছরের পর বছর লেগে যেতে পারে।
এদিকে চমেক হাসপাতালের কয়েকজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বলছেন, তাদের কাছে যেসব রোগী আসছেন এর মধ্যে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশই হচ্ছে জ্বরের রোগী। চিকুনগুনিয়া পরীক্ষা দেয়ার পরে অনেক রোগী শুধু টাকার জন্য পরীক্ষা করাতে পারছেন না। তাই সরকারি পর্যায়ে চিকুনগুনিয়া পরীক্ষা শুরু হলে রোগীরাও উপকৃত হতো।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তের হার বাড়ছে। আমরা যখন ২৮ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিকুনগুনিয়া পরীক্ষা ব্যবস্থা নিতে এবং রেপিড টেস্ট কিট সরবরাহের ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লিখেছিলাম তখন আক্রান্ত চট্টগ্রামে আক্রান্ত ছিল ৮০৩ জন। এখন সেটি এক হাজার ৯০০ জন হয়ে গেছে।
আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে এখন পর্যন্ত আশানুরূপ সাড়া পাইনি। তবে শুনেছি এখন পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কিট কিনতে পারেনি। কিট পাওয়া গেলে ৩০০ টাকা চিকুনগুনিয়ার পরীক্ষা করা যেত। এতে রোগীরা উপকৃত হতো।
