সংশ্লিষ্টদের মতে, ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শনিবার (১৯ জুলাই) এ তথ্য নিশ্চিত করেন জেলা সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম।
সিভিল সার্জন বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত ৩২ জনের মধ্যে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৯ জন, বিআইটিআইডি হাসপাতালে ১৩ জন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১ জন, উপজেলার সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ৫ জন ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ৬৭৫ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের। এর মধ্যে শুধু চলতি জুলাই মাসেই ২৩০ জন আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে ৩১০ জন শহর এলাকার এবং ৩৬৫ জন জেলার বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। এছাড়া আক্রান্তদের মধ্যে ৩৭৭ জন পুরুষ, ১৮৭ জন নারী এবং ১১১ জন শিশু।
চট্টগ্রামে উপজেলা পর্যায়ে ৩৬৫ জন আক্রান্তদের মধ্যে বাঁশখালীতে ৮৮ জন, সীতাকুণ্ডে ৭৮ জন, আনোয়ারায় ৩০ জন, সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ায় ২৩ জন করে, রাউজানে ১৩ জন, পটিয়ায় ৯ জন, মীরসরাই ও কর্ণফুলীতে ৮ জন, চন্দনাইশে ৭ জন, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়িতে ৬ জন করে, বোয়ালখালী ও হাটহাজারীতে ৫ জন করে এবং সন্দীপে ৩ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলায় ২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ৪ হাজার ৩২৩ জন এবং মারা গেছেন ৪৫ জন। ২০২৩ সালে আক্রান্ত হন ১৪ হাজার ৮৭ জন এবং মারা গেছেন ১০৭ জন। ২০২২ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ৫ হাজার ৪৪৫ জন এবং মারা যান ৪১ জন। সংক্রমণের বর্তমান প্রবণতা দেখে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ২০২৩ সালের ভয়াবহতা যেন আবার ফিরে না আসে- তবে চলতি বছরের চিত্র সেই আশঙ্কাই বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নগর ও গ্রামীণ এলাকায় নিয়মিতভাবে জমে থাকা পানি পরিষ্কার না করলে এডিস মশার বিস্তার রোধ করা যাবে না। মশা নিধন কার্যক্রম জোরদার করাসহ প্রতিটি পরিবারকে অন্তত সপ্তাহে একবার বাড়ির আশপাশে মশার প্রজননস্থল খুঁজে ধ্বংস করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
একইসাথে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে চিকুনগুনিয়া ভয়াবহ রূপ নিয়েছে মশাবাহিত ভাইরাস জ্বর চিকুনগুনিয়া। আক্রান্ত হচ্ছেন একই পরিবারের একাধিক সদস্য। স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়মিত তথ্য বিবরণীতে ডেঙ্গু ও কোভিড থাকলেও চিকুনগুনিয়ার কোন তথ্যই মিলে না। যদিও বেসরকারি ল্যাবগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে চিকুনগুনিয়া সংক্রমণের হার ৮০ শতাংশের বেশি। যা উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন চিকিৎসকগণ। যে হারে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, সমহারে পদেক্ষেপ নেয়া তো দূরে থাক, দৃশ্যমান তৎপরতাও দেখা যাচ্ছে না।
চট্টগ্রামে তিনটি বেসরকারি ল্যাবের তথ্যমতে, প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। এপিক হেলথ কেয়ারে ১৮৫ জন রোগীর মধ্যে ১৫৩ জনের চিকুনগুনিয়া পজিটিভ এসেছে; শনাক্তের হার ৮২ শতাংশ। এভারকেয়ার হাসপাতালের ল্যাবে ১৩২ জনের পরীক্ষা করে ৬৫ জনের মধ্যে রোগটি ধরা পড়ে। পার্কভিউ হাসপাতালের পাঁচদিনের রিপোর্ট বলছে, ৫৩ জনের মধ্যে ৪২ জনের দেহে চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গড়ে শতকরা ৭৯ ভাগ আক্রান্ত।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আবুল ফয়সাল মো. নুরুদ্দীন চৌধুরী বলেন, এবার একসঙ্গে একাধিক ভাইরাস ছড়াচ্ছে। উপসর্গ একই হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে এটি চিকুনগুনিয়া। শুরুতে ধরা না পড়লেও পরে বোঝা যাচ্ছে রোগী আসলে চিকুনগুনিয়াতেই আক্রান্ত। আমাদের কাছে যে পরিমাণ জ্বরের রোগী আসছে, তার প্রায় ৮০ শতাংশই চিকুনগুনিয়ার লক্ষণধারী। পরীক্ষার খরচ বেশি হওয়ায় অনেকে ল্যাবে যাচ্ছেন না।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে ঢাকায় প্রথম বড় পরিসরে চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তখন ১৪ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। ২০২৪ সালে ডিসেম্বরে ফের এই রোগে আক্রান্ত হন ৬৭ জন। চলতি বছরও সংক্রমণের চিত্র সেই মাত্রাকেই ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
