অ্যাসিড, মিথানল ও থিনারের মতো বিপজ্জনক রাসায়নিকের এসব কনটেইনারের কোনো কোনোটি ১৫ থেকে ২০ বছরের পুরোনো। আমদানিকারকের পণ্য খালাস না করা, নিলামপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা অব্যবহৃত।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, এসব রাসায়নিকের কোনো একটি কনটেইনারে আগুন লাগলে তা আশপাশের পণ্য ও অবকাঠামোয় ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি ব্যাহত হতে পারে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রম। রাসায়নিকের ধরন অনুযায়ী বিষাক্ত বাষ্প ছড়িয়ে পড়া এবং মাটি ও পানি দূষিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিপজ্জনক পণ্য দ্রুত নিরাপদে নিষ্পত্তির দাবি উঠেছে। আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা অনুযায়ী, কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে এসব পণ্য অপসারণের উদ্যোগ নিয়েছে।
২০২০ সালে লেবাননের বৈরুত বন্দরে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের ভয়াবহ বিস্ফোরণে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনা বিশ্বজুড়ে সমুদ্রবন্দরে বিপজ্জনক রাসায়নিকের নিরাপদ সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক জমে থাকা এবং কনটেইনারের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ার বিষয়টি সেই নিরাপত্তা উদ্বেগকে নতুন করে সামনে এনেছে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিষ্পত্তির জন্য ৩১৮টি বিপজ্জনক পণ্যবাহী কনটেইনার কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, বন্দরে বিপজ্জনক রাসায়নিকবাহী কনটেইনার রয়েছে ৩২৩ টিইইউ। এর মধ্যে ৪৪টি জরাজীর্ণ। অর্থাৎ, নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিপজ্জনক রাসায়নিকের পুরো মজুত অপসারণের বিষয়টি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বন্দরে ৩০০ টিইইউর বেশি বিপজ্জনক পণ্য রয়েছে। এসব পণ্য সরিয়ে নিতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হচ্ছে। কাস্টমস পর্যায়ক্রমে নিলাম ও ধ্বংসের কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, বন্দরে এমনিতেই জায়গার সংকট রয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ কনটেইনার পড়ে থাকায় মূল্যবান জায়গা আটকে আছে। এসব কনটেইনারের বিপজ্জনক দাহ্য পদার্থ ও রাসায়নিক সরানো না হলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই দ্রুত কনটেইনারগুলো সরিয়ে বন্দরকে ঝুঁকিমুক্ত করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আমদানির ৩০ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস না হওয়ায় নিলামে বিক্রির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বিপজ্জনক রাসায়নিকের ক্ষেত্রে সাধারণ পণ্যের মতো নিলামপ্রক্রিয়া অনুসরণ করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। রাসায়নিকের ধরন, ব্যবহারযোগ্যতা, সংরক্ষণের অবস্থা ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে পৃথকভাবে ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা অনুযায়ী এসব পণ্য নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ করে দরপত্র ও নিলামপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ব্যবহারযোগ্য রাসায়নিক আইনানুগভাবে নিলামে বিক্রি করা যেতে পারে। তবে মেয়াদোত্তীর্ণ, ব্যবহার অনুপযোগী কিংবা অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক উপযুক্ত স্থাপনায় নিরাপদে ধ্বংস করতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাসায়নিকের প্রকৃতি নির্ধারণ, নিরাপদ পরিবহন এবং পরিবেশগত বিধিবিধান অনুসরণ করা জরুরি।
বন্দরে পড়ে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক অপসারণে সম্প্রতি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে নয়টি কনটেইনারের রাসায়নিক নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডের কারখানায় ধ্বংসের জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এসব কনটেইনারে মোট ১৫০ দশমিক ৮৯ টন রাসায়নিক ছিল। এর মধ্যে রয়েছে ২৫ দশমিক ৫৫ টন সালফিউরিক অ্যাসিড, ৫০০ কেজি নাইট্রিক অ্যাসিড, ৯২ দশমিক ৫৪ টন মিথানল এবং ৩২ দশমিক ৩০ টন থিনার। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, পরীক্ষামূলকভাবে ওই কারখানায় আটটি কনটেইনারের রাসায়নিক ধ্বংসের প্রক্রিয়া সফল হয়েছে। তবে বন্দরে পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক নিরাপদে নিষ্পত্তির জন্য আরও বড় পরিসরের সক্ষমতা ও উপযুক্ত স্থাপনা প্রয়োজন।
এদিকে রাসায়নিক পরিবহনে ব্যবহৃত একটি কাভার্ড ভ্যানে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর এলাকায় আগুন লাগার ঘটনাও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, গাড়িতে থাকা ড্রামগুলো খালি ছিল এবং প্রাথমিকভাবে ইঞ্জিন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তাই ঘটনাটিকে রাসায়নিকের বিস্ফোরণ হিসেবে বর্ণনা করার ভিত্তি নেই। তবে বিপজ্জনক পণ্য পরিবহনে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার গুরুত্ব আবারও সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন বলেন, বন্দরে দীর্ঘদিন বিপজ্জনক রাসায়নিক পড়ে থাকা এবং জরাজীর্ণ কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসার ঘটনা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। এসব রাসায়নিকের কারণে মাটি, পানি ও বায়ুদূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, রাসায়নিকের ধরন ও ঝুঁকি নিরূপণ করে পরিবেশগত আইন ও বিধিবিধান অনুসরণ করে দ্রুত নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনারগুলো নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, সম্ভাব্য দূষণ প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের সাবেক সহকারী পরিদর্শক এস. এম শাখাওয়াত হোসেনও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, রাসায়নিকের ধরন, সংরক্ষণব্যবস্থা ও বর্তমান অবস্থা যাচাই করে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণ করা জরুরি। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে এলে দ্রুত নিরাপদ সংরক্ষণ ও বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিতে হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। সেখানে বছরের পর বছর বিপজ্জনক রাসায়নিক পড়ে থাকা এখন আর শুধু পণ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়; এটি বন্দর নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। নিলামযোগ্য রাসায়নিকের দ্রুত নিষ্পত্তি, ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য নিরাপদে ধ্বংস এবং জরাজীর্ণ কনটেইনার অপসারণে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।