সদ্য সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে টানা সপ্তম দিনেও চলছে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’। বন্ধ রয়েছে ক্লাস-পরীক্ষা। ক্যাম্পাসের মূল ফটক বন্ধ রেখে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা।
একই দাবিতে সর্বাত্মক কর্মবিরতিতে রয়েছেন শিক্ষকরা। কর্মবিরতিতে যোগ দিয়েছেন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও। সব মিলিয়ে এক সপ্তাহ ধরে চুয়েটের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। আন্দোলনকারীদের মূল প্রশ্ন—দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় কেন অধ্যাপক সায়েমকে সরিয়ে দেওয়া হলো?
সোমবার সকাল ৮টা থেকে ক্যাম্পাসের মূল ফটক বন্ধ করে শাটডাউন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। সকাল ৯টা থেকে শুরু হয় গণস্বাক্ষর সংগ্রহ। দিনভর বিক্ষোভ ও গণঅবস্থান কর্মসূচির পাশাপাশি আজ বিক্ষোভ মিছিল করার কথাও জানিয়েছে তারা। চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নিয়োগ দিয়ে গত ২১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
অথচ এর মাত্র ৫৬ দিন আগে, গত ২৭ জুলাই অধ্যাপক সায়েমকে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। নিয়োগের পর মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসার পরই আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় কমপ্লিট শাটডাউন। এরপর দিন যত গড়িয়েছে, আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অংশীজন।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, তাদের আপত্তি নতুন উপাচার্যের ব্যক্তিগত বা একাডেমিক যোগ্যতা নিয়ে নয়; দৃশ্যমান কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই অধ্যাপক সায়েমকে পরিবর্তনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই তাদের অবস্থান। গত রবিবার ‘৫৬’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। কর্মসূচির নাম দেওয়া হয় ‘প্রশ্নযাত্রা’।
প্ল্যাকার্ডে ৫৬-এর পাশে প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে তারা জানতে চান—৫৬ দিনের মধ্যেই কেন একজন উপাচার্যকে সরিয়ে দেওয়া হলো। শহীদ মিনার থেকে মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা চত্বর ঘুরে আবার শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। অবস্থান কর্মসূচির একপর্যায়ে পথনাট্যের মাধ্যমে নতুন উপাচার্যের যোগদানকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থী সাকিবুর রহমান বলেন, তাদের কর্মসূচিতে একটি প্রশ্নই তুলে ধরা হয়েছে—“৫৬ দিনেই কেন অধ্যাপক সায়েমকে অপসারণ করা হয়েছে।”
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দাবি করছেন, অধ্যাপক সায়েম দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক কলাবোরেশন অফিস, রিসার্চ হাব, ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সংযোগসহ বিভিন্ন উদ্যোগ শুরু করেছিলেন। তাদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া গেলে চুয়েটের শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন দৃশ্যমান হতে পারত।
তাদের ভাষ্য, সায়েম শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা শুনেছেন এবং সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছেন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিলেন। তবে এসব দাবির স্বাধীন মূল্যায়ন বা সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলোর বাস্তব অগ্রগতির বিস্তারিত তথ্য আন্দোলনকারীদের বক্তব্যের বাইরে নথিতে পাওয়া যায়নি।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে চুয়েট শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও কর্মচারী সংগঠনগুলো। ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে জরুরি সভায় শিক্ষক সমিতি সর্বাত্মক কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত নেয়। হল ও জরুরি কার্যক্রম অবশ্য কর্মবিরতির আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। গতকাল সোমবারও দ্বিতীয় দিনের মতো কর্মবিরতি পালন করেন শিক্ষকরা। প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন তারা।
শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, চলমান অচলাবস্থার কারণে শিক্ষার্থীরা একাডেমিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান করে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন রক্ষার আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, ২৫ সেপ্টেম্বর জরুরি সাধারণ সভায় কর্মকর্তা সমিতিও কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত নেয়। কর্মচারী সমিতিও একই দাবিতে কর্মবিরতি চালিয়ে যাচ্ছে।
অচলাবস্থার মধ্যেই নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম বিশ্ববিদ্যালয়ে না এসে রাষ্ট্রপতি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর যোগদানপত্র পাঠিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের কথা জানান। এরপর শনিবার নতুন উপাচার্যকে প্রত্যাখ্যান করে ‘লাল কার্ড’ প্রদর্শন কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা।
নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম অবশ্য আন্দোলনকারীদের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তিনি বলেছেন, “গুটি কয়েক শিক্ষার্থী এ আন্দোলনের নামে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করছে।” তার দাবি, অধিকাংশ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মচারী তাকে উপাচার্য হিসেবে চাইছেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামে অবস্থান করে সার্কিট হাউস থেকে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এবং শিগগিরই ক্যাম্পাসে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন।
‘প্রশ্নযাত্রা’ শেষে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষার্থীরা সরকারপ্রধানের হস্তক্ষেপ দাবি করেন। তাদের বক্তব্য, আন্দোলনটি সরকারবিরোধী নয়; তাদের একমাত্র দাবি অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে চুয়েটের উপাচার্য পদে পুনর্বহাল করা।
তবে আন্দোলন দীর্ঘায়িত হওয়ায় সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে একাডেমিক কার্যক্রমে। এক সপ্তাহ ধরে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের সেশন, পরীক্ষা ও শিক্ষা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আন্দোলনরত এক শিক্ষার্থী বলেছেন, তারা দ্রুত একাডেমিক কার্যক্রমে ফিরতে চান; কিন্তু এজন্য আগে তাদের দাবি মেনে নিতে হবে।
