অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে সিগারেটের ফিল্টার তৈরির কাঁচামাল আমদানি করে অবৈধভাবে বাজারজাতের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকার রাজস্ব ঝুঁকির ঘটনা শনাক্ত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)। একই সঙ্গে আরও চারটি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে একই ধরনের কাঁচামাল আমদানির তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাটি।
সম্প্রতি চট্টগ্রাম কাস্টমস দিয়ে খালাসের অপেক্ষায় থাকা ৪৮ টন অ্যাসিটেট স্ট্র আটক করে সিআইসি। গত ১৮ আগস্ট মতিঝিলের ‘ইউনিক ট্রেডার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালানটি আমদানি করে। তবে সরেজমিনে ওই প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাননি কর্মকর্তারা।
চালানটির আমদানি পর্যায়ে ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় নিশ্চিত হয়েছে। কিন্তু সিআইসির হিসাবে, এই কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহার করা হলে শুধু এ চালান থেকেই প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। উচ্চমূল্যের সিগারেট উৎপাদন হলে সম্ভাব্য রাজস্বের পরিমাণ আরও বেশি—প্রায় ৫৬৪ কোটি টাকা।
এক প্রতিষ্ঠানেই ৩৬৩ টন
সিআইসির অনুসন্ধানে আরও বড় চিত্র উঠে এসেছে। আমদানি নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউনিক ট্রেডার্স মোট ৩৬৩ টন সিগারেটের কাঁচামাল আমদানি করেছে। এসব কাঁচামাল কোথায় গেছে, কার কাছে বিক্রি হয়েছে এবং কীভাবে ব্যবহার করা হয়েছে—তা খতিয়ে দেখছে এনবিআর।
সিআইসির প্রাথমিক হিসাবে, পুরো কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়ে থাকলে প্রায় ২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা রাজস্ব ঝুঁকিতে পড়েছে।
এ ঘটনায় আরও চারটি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে একই ধরনের কাঁচামাল আমদানির তথ্য পেয়েছে সিআইসি। প্রতিষ্ঠানগুলোর আমদানি ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
সিআইসির এক কর্মকর্তা জানান, গত ২৪ আগস্টের গেজেট অনুযায়ী ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের সিগারেটের কাঁচামাল আমদানির সুযোগ নেই। তবে ইউনিক ট্রেডার্স গেজেট জারির আগেই চালান আমদানি করায় সেটি খালাসের সুযোগ ছিল। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে চালানটি আটক করা হয়।
আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কেউ সাড়া না দেওয়ায় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ফাইজ ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেড সিআইসির সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং চালানটির সংশ্লিষ্ট রাজস্ব পরিশোধ করে।
পুরোনো চক্র, নতুন তথ্য
অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে সিগারেটের কাঁচামাল আমদানি করে অবৈধ সিগারেট তৈরির ঘটনা নতুন নয়। ২০২৪ সালের জুনে এ বিষয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর তৎকালীন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ফখরুল আলমকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
ওই কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, অন্তত ২০টি ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের নামে সিগারেটের কাঁচামাল এনে দেশে নকল সিগারেট তৈরি করছে একটি চক্র। এর মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠানই ছিল অস্তিত্বহীন।
পরবর্তী সময়ে ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের জন্য কাঁচামাল আমদানিতে দ্বিগুণ শুল্ক আরোপ করা হলেও অবৈধ সিগারেটের কাঁচামাল আমদানি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সর্বশেষ ২৪ আগস্টের গেজেটে শুধু সিগারেট ও বিড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে এ ধরনের কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
৪৮ টনেই ৪৩ কোটি শলাকা!
সিআইসির হিসাবে, দুটি সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মূল্য ঘোষণা অনুযায়ী প্রতি কেজি অ্যাসিটেট স্ট্র থেকে প্রায় ৮ হাজার ৯৩৭ শলাকা সিগারেট উৎপাদন সম্ভব। সে হিসাবে আটক হওয়া ৪৮ হাজার ১৪৩ কেজি কাঁচামাল দিয়ে প্রায় ৪৩ কোটি ২ লাখ ৫৪ হাজার শলাকা, অর্থাৎ ১০ শলাকার হিসাবে প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ প্যাকেট সিগারেট তৈরি করা সম্ভব।
মিডিয়াম সেগমেন্টের প্রতি প্যাকেট সিগারেটের খুচরা মূল্য ৯২ টাকা এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে প্রযোজ্য রাজস্বের হার প্রায় ৮২ শতাংশ ধরে সম্ভাব্য রাজস্ব দাঁড়ায় প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা। আর ১৬০ টাকা খুচরা মূল্যের হাই সেগমেন্টের সিগারেট হিসেবে হিসাব করলে সম্ভাব্য রাজস্ব প্রায় ৫৬৪ কোটি টাকা।
এখন এনবিআরের অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন—৩৬৩ টন কাঁচামাল কোথায় গেল, কারা ব্যবহার করল এবং এর মাধ্যমে বাজারে কত সিগারেট ঢুকেছে? সিআইসি বলছে, এসব কাঁচামালের প্রকৃত ব্যবহার ও সরবরাহ চেইন শনাক্তে তদন্ত চলছে।