মূল সংবাদে যান
অপরাধ

১৪ ফ্ল্যাটে দেড় মাসের অনলাইন প্রতারণা আস্তানার ৬৩ বিদেশি গ্রেপ্তার, উদ্ধার ১৭০ ইলেকট্রনিক ডিভাইস

চট্টগ্রাম নগরের অভিজাত আবাসিক এলাকায় একটি বহুতল ভবনের ১৪টি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে দেড় মাস ধরে অনলাইন প্রতারণার ‘আস্তানা’ গড়ে তুলেছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্র।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

বাইরে থেকে সাধারণ আবাসিক ভবন মনে হলেও এসব ফ্ল্যাটে স্থাপন করা হয়েছিল কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, সার্ভারসহ বিপুলসংখ্যক প্রযুক্তি সরঞ্জাম।

এসব ডিভাইস ব্যবহার করে দেশ-বিদেশের মানুষের সঙ্গে অনলাইনে যোগাযোগ এবং প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।

গোপন তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ওই ভবন থেকে ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট ও খুলশী থানা পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপসহ মোট ১৭০টি ইলেকট্রনিক ডিভাইস উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

গ্রেপ্তারদের মধ্যে ৩৫ জন লাওসের, ২১ জন পাকিস্তানের, পাঁচজন চীনের এবং নেপাল ও ভিয়েতনামের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ২০ জন নারী রয়েছেন।

১৪ ফ্ল্যাটে আলাদা আলাদা কর্মস্থল

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, খুলশী থানার জালালাবাদ-কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার একটি আটতলা ভবনের ১৪টি ইউনিট প্রায় দেড় মাস আগে ভাড়া নেয় চক্রটি। ভবনটির মালিক দুবাইপ্রবাসী। স্থানীয় কিছু ব্যক্তির সহযোগিতায় ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া নেওয়া হয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।

প্রতিটি ইউনিটকে কার্যত আলাদা কর্মস্থল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। সেখানে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, সার্ভারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়। একটি আবাসিক ভবনের ১৪টি ইউনিট একই সঙ্গে ভাড়া নিয়ে এতদিন ধরে এমন কার্যক্রম চালানোর বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে।

১১ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরের দামপাড়া পুলিশ লাইন্সের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) ফয়সাল আহম্মেদ এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, চীন, লাওস, কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অনলাইন প্রতারণার বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার হওয়ায় প্রতারকরা বাংলাদেশকে তাদের কার্যক্রমের জন্য ব্যবহার করে থাকতে পারে।

চাকরির প্রলোভন, ওয়েবসাইট ও ব্যাংক তথ্য

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, চক্রটি বিভিন্ন আকর্ষণীয় ওয়েবসাইট তৈরি করে মানুষকে সেখানে আকৃষ্ট করত। কখনো চাকরির প্রলোভন, কখনো বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কথা বলে মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হতো।

এর পাশাপাশি অনলাইন জুয়া বা ক্যাসিনো ধরনের কার্যক্রমের সঙ্গে চক্রটির সম্পৃক্ততার বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে। বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকের লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য হ্যাক করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

তবে এখন পর্যন্ত কতজন ভুক্তভোগী এবং কী পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

৬৩ জনই কি মূল চক্রের সদস্য?

এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—গ্রেপ্তার ৬৩ বিদেশিই কি প্রতারণা চক্রের মূল সদস্য?

পুলিশের ভাষ্য, প্রাথমিকভাবে তাঁদের চক্রটির ‘মাঠপর্যায়ের কর্মী’ বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ অনলাইনে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ, ওয়েবসাইট পরিচালনা এবং প্রতারণার বিভিন্ন ধাপ বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাঁদের ওপর ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কিন্তু তাঁদের নিয়ন্ত্রণ করত কারা, কে তাঁদের বাংলাদেশে এনেছে, কে ১৪টি ফ্ল্যাট ভাড়া করে দিয়েছে, তাঁদের পারিশ্রমিক কে দিত এবং প্রতারণার অর্থ কোথায় জমা হতো—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি।

পুলিশ জানিয়েছে, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা দেশি-বিদেশি আরও কয়েকজনের বিষয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

পাসপোর্ট-ভিসা নেই ৬৩ বিদেশির কাছে

তদন্তে আরেকটি বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের ভ্রমণ নথি নিয়ে। পুলিশের দাবি, তাঁদের কারও কাছেই পাসপোর্ট বা ভিসা পাওয়া যায়নি। এসব নথি বাংলাদেশি একটি চক্রের সদস্যদের কাছে রয়েছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে।

একই ভবনে ৬৩ জন বিদেশি নাগরিক অবস্থান করলেও তাঁদের কাছে পাসপোর্ট-ভিসা না থাকার বিষয়টি তদন্তকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তাঁরা কীভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন, তাঁদের ভিসার ধরন কী ছিল এবং কার মাধ্যমে তাঁরা দেশে এসেছেন—এসব জানতে পুলিশের বিশেষ শাখার কাছ থেকে তথ্য নেওয়া হচ্ছে।

পুলিশ বলছে, এ ঘটনায় দেশীয় সহযোগীদের শনাক্ত করা গেলে বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে আনা এবং পুরো প্রতারণা নেটওয়ার্ক পরিচালনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

১৭০ ডিভাইসেই লুকিয়ে থাকতে পারে নেটওয়ার্কের তথ্য

অভিযানে উদ্ধার হওয়া ১৭০টি ইলেকট্রনিক ডিভাইস এখন তদন্তের অন্যতম প্রধান আলামত। এর মধ্যে রয়েছে ১৩৪টি মোবাইল ফোন ও ৫৭টি ল্যাপটপ। পুলিশ জানিয়েছে, এসব ডিভাইস ফরেনসিক পরীক্ষা করা হবে।

ফরেনসিক বিশ্লেষণে চক্রটির ব্যবহৃত ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট, যোগাযোগের ইতিহাস, অর্থ লেনদেন, সম্ভাব্য ভুক্তভোগী এবং দেশি-বিদেশি সহযোগীদের পরিচয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পাশাপাশি পাঁচটি পেনড্রাইভ, চারটি সিম কার্ড, তিনটি পাকিস্তানি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং একটি কম্বোডিয়ান কর্মসংস্থান কার্ডও উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

কক্সবাজারের ঘটনার সঙ্গে যোগসূত্র?

চট্টগ্রামের ঘটনার কয়েক দিন আগেই কক্সবাজারে বিদেশি নাগরিকদের আরেকটি দলকে বিপুল প্রযুক্তি সরঞ্জামসহ আটকের ঘটনা সামনে আসে। ৩ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজারের একটি হোটেল থেকে ছয় বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়। তাঁদের কাছ থেকে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন এবং প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি ল্যাপটপসহ বিভিন্ন যোগাযোগ সরঞ্জাম উদ্ধারের কথা জানানো হয়েছে।

আটক ছয়জনের মধ্যে পাঁচজন চীনের এবং একজন তাইওয়ানের নাগরিক।

চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার—দুই ঘটনায়ই বিদেশি নাগরিক, বিপুল প্রযুক্তি সরঞ্জাম এবং অনলাইনভিত্তিক অপরাধের অভিযোগ সামনে আসায় সম্ভাব্য যোগসূত্র এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে চট্টগ্রাম পুলিশ এখনো দুই ঘটনার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। ফলে বিষয়টি আপাতত তদন্তাধীন।

সামনে বড় তদন্তের চ্যালেঞ্জ

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ৬৩ জনকে প্রাথমিকভাবে চক্রটির মাঠপর্যায়ের সদস্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং জব্দ ডিভাইসের ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে মূলহোতাদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

ইতোমধ্যে ৬২ জনের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা হয়েছে এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চাওয়া হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ফলে এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য শুধু ৬৩ বিদেশির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করা নয়; বরং কে তাঁদের বাংলাদেশে এনেছে, ১৪টি ফ্ল্যাট ভাড়া করিয়েছে কারা, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো নিয়ন্ত্রণ করত কে, প্রতারণার অর্থ কোথায় যেত এবং দেশীয় সহযোগীদের নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা।

এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই চট্টগ্রামের আবাসিক ভবনে গড়ে ওঠা অনলাইন প্রতারণার এই আস্তানার প্রকৃত নেটওয়ার্ক ও অর্থনৈতিক পরিধি স্পষ্ট হতে পারে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • অনলাইন প্রতারণা

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন