এতে বন্ধ হয়ে যায় বা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় যান চলাচল; দুর্ভোগে পড়েন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীরা। অনেক আবাসিক ভবনের নিচতলা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও পানি ঢুকে পড়ে।
নগরের চকবাজার, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ, জামালখান, মুরাদপুর, জিইসি, প্রবর্তক, বাকলিয়া, আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, মুহুরিপাড়া, দক্ষিণ হালিশহর, পাঠানটুলী, কাপাসগোলা ও পতেঙ্গার বিভিন্ন নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয় চকবাজার, কাতালগঞ্জ ও আগ্রাবাদের কয়েকটি এলাকায়। এসব এলাকায় কোমরসমান পানি জমে থাকায় যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে পানির মধ্য দিয়েই গন্তব্যে যেতে হয় নগরবাসীকে।
গতকাল সোমবার সকালে চকবাজার ও কাতালগঞ্জ এলাকায় দেখা যায়, সড়কের ওপর কোমরসমান পানি। পানি মাড়িয়ে পথচারীদের চলাচল করতে হচ্ছে। গণপরিবহন ও রিকশার সংকটের সুযোগে কোনো কোনো চালক কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দাবি করেন। ফলে অনেক অফিসগামী মানুষ দীর্ঘ পথ হেঁটেই কর্মস্থলে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার মুহুরিপাড়াতেও একই চিত্র দেখা যায়। সড়কে পানি জমে আবাসিক ভবনের নিচতলা পর্যন্ত তলিয়ে যায়। যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় বাসিন্দাদেরও পানির মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হয়েছে। স্থানীয় চাকরিজীবীদের অভিযোগ, সামান্য বৃষ্টিতেই আগ্রাবাদের বিভিন্ন সড়কে পানি জমে; তবে এবার রাতভর বৃষ্টিতে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
জলাবদ্ধতার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও এর প্রভাব পড়ে। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে এবং আশপাশের সড়কে পানি জমে থাকায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। পরিবহনসংকটের কারণে অনেক শিক্ষার্থী সোমবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে পারেনি। কোথাও কোথাও শ্রেণি কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে।
অতিবৃষ্টির প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেন চলাচলেও। রেললাইনে পানি উঠে যাওয়ায় বটতলা রেলস্টেশন থেকে ছেড়ে আসা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি শাটল ট্রেন ষোলশহর স্টেশনে আটকে যায়। সকাল ৭টা ১৫ মিনিট ও ৭টা ৪০ মিনিটে ছেড়ে আসা ট্রেন দুটি দীর্ঘ সময় সেখানে আটকে থাকায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী স্টেশন ছেড়ে চলে যান। কিছু শিক্ষার্থী অবশ্য ট্রেনের ভেতরেই অবস্থান করেন।
ষোলশহর স্টেশনমাস্টার মো. মাঈন উদ্দিন জানান, রেললাইনের ওপর প্রায় ৮ ইঞ্চি পানি ছিল। পানি না কমা পর্যন্ত ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। শাটল ট্রেন বন্ধ থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা চলমান থাকলেও শাটল ট্রেন বন্ধ হওয়ার পর বিকল্প বাসের ব্যবস্থা করা হয়নি। চাকসুর যোগাযোগ ও আবাসনবিষয়ক সম্পাদক ওবায়দুল সালমান বলেন, শাটল ট্রেন বন্ধ থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ রাখার ব্যবস্থা থাকা উচিত। কারণ এটি শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ১০৯ মিলিমিটার।
আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাবে সমুদ্রবন্দর, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা ইসমাইল ভূঁইয়া জানান, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় এবং সাগরে লঘুচাপের প্রভাবে এ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। আগামী কয়েক দিন চট্টগ্রামসহ উপকূলীয় এলাকায় হালকা থেকে ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। আগস্টজুড়েই বৃষ্টির প্রবণতা থাকতে পারে; সেপ্টেম্বর থেকে তা ক্রমান্বয়ে কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে। কিন্তু বিপুল অর্থ ব্যয়ের এসব প্রকল্পের কাজ চলার মধ্যেই সামান্য সময়ের ব্যবধানে নগরের বিভিন্ন এলাকা আবারও হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নগরবাসীর প্রশ্ন—জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়, নতুন খাল-নালা ও ড্রেনেজ অবকাঠামো নির্মাণ এবং একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও কেন সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই একই এলাকাগুলো বারবার পানিতে ডুবে যাচ্ছে?
বিশেষজ্ঞ ও নগরবাসীর মতে, শুধু বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করলেই জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হবে না। পানি নিষ্কাশনের পথ দখলমুক্ত রাখা, খাল-নালা ও ড্রেনের ধারণক্ষমতা বাড়ানো, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, বর্জ্য অপসারণ এবং পুরো নগরের পানি নিষ্কাশনব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণের পরও বৃষ্টির পানিতে নগরবাসীর দুর্ভোগ অব্যাহত থাকবে—এমন আশঙ্কাই এখন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।