সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, এ ঘটনা নিছক দুর্ঘটনা নয়; দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘন এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতার কারণেই এমন মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে।
রবিবার দুপুর ২টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশ ও মানববন্ধনে বক্তারা এসব কথা বলেন। জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত। সদস্যসচিব ফজলুল কবির মিন্টু কর্মসূচি সঞ্চালনা করেন।
সমাবেশে কবি আবুল মোমেন, বন্দর ও জাতীয় সম্পদ রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক (ডা.) এম আবু সাঈদ, ফোরামের যুগ্ম আহ্বায়ক এএম নাজিম উদ্দিন, কোষাধ্যক্ষ রিজওয়ানুর রহমান খান, সদস্য নুরুল আবসার, বাংলাদেশ ফ্রি ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কেএম শহিদুল্লাহ, বাংলাদেশ মুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মো. ইদ্রিস এবং জাহাজভাঙা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মানিক মণ্ডলসহ অন্যরা বক্তব্য দেন।
কবি আবুল মোমেন বলেন, একটি ইয়ার্ডে একই ঘটনায় ৯ শ্রমিকের প্রাণহানি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও উদ্বেগজনক। শ্রমিকের জীবন কোনোভাবেই শিল্পের উৎপাদন ও মুনাফার চেয়ে কম মূল্যবান হতে পারে না। জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকেও কার্যকরভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
অধ্যাপক এম আবু সাঈদ বলেন, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মালিক ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি দুর্ঘটনায় একসঙ্গে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু প্রমাণ করে কোথাও গুরুতর নিরাপত্তা ঘাটতি ছিল। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এএম নাজিম উদ্দিন বলেন, জাহাজের ট্যাংক বা অন্য কোনো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে শ্রমিকদের কাজ করানোর আগে গ্যাস পরীক্ষা ও অক্সিজেনের মাত্রা পরিমাপ বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল এবং কাজ চলাকালে নিয়মিত গ্যাস মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে এসব নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের পর্যাপ্ত রেসপিরেটরি মাস্ক ও অন্যান্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা দরকার। যথাযথ রেসপিরেটরি সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকলে এতগুলো প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হতো কি না, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ফোরামের আহ্বায়ক তপন দত্ত বলেন, একটি ইয়ার্ডে একই ঘটনায় ৯ শ্রমিকের মৃত্যু অত্যন্ত ভয়াবহ ও নজিরবিহীন। জাহাজভাঙা শিল্পে গত ২৫ বছরে একসঙ্গে এত শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, এ মৃত্যুকে শুধু দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি ও দায়িত্বশীলদের অবহেলা ছিল কি না, তা খুঁজে বের করতে হবে।
তপন দত্ত আরও বলেন, যে জাহাজকে ‘গ্যাস ফ্রি’ সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছিল, সেই জাহাজের ট্যাংকে কীভাবে বিষাক্ত গ্যাস পাওয়া গেল—এটি তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গ্যাস ফ্রি সার্টিফিকেট দেওয়ার আগে যথাযথ পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না এবং সার্টিফিকেট দেওয়ার পর জাহাজে নিয়মিত গ্যাস পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, তা তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
ফোরামের নেতারা বলেন, দক্ষ শ্রমিক ও অনুমোদিত কন্ট্রাক্টরের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানোর দাবি শ্রমিকদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে জানানো হচ্ছে। কিন্তু তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে শ্রমিকদের প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।
তাঁদের অভিযোগ, জাহাজভাঙা শিল্পে বছরের পর বছর দুর্ঘটনা ও শ্রমিকের মৃত্যু ঘটলেও কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তদন্ত শেষে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর মামলা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এতে মালিকপক্ষ নিরাপত্তা বিধি মানার ক্ষেত্রে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
ফেরদৌস স্টিলের দুর্ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নয় সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, শুধু তদন্ত কমিটি গঠন করলেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। তদন্ত অবশ্যই নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। দায়ীদের শনাক্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
সমাবেশ থেকে নিহত ৯ শ্রমিকের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া, আহত শ্রমিকদের সম্পূর্ণ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ী মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া প্রতিটি জাহাজে কাজ শুরুর আগে এবং কাজ চলাকালে বাধ্যতামূলক গ্যাস পরীক্ষা ও নিয়মিত গ্যাস মনিটরিং, শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং ঝুঁকিপূর্ণ কাজে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ শ্রমিক নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবি জানান তাঁরা।
নেতারা বলেন, শ্রমিকের জীবন কোনোভাবেই মালিকের মুনাফার চেয়ে কম মূল্যবান নয়। জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করে জবাবদিহি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।