মূল সংবাদে যান
জাতীয়

টেকসই চট্টগ্রাম গড়তে পুকুর-জলাশয় রক্ষায় সিডিএর মহাপরিকল্পনা

একসময় পাহাড়, খাল, নদী, দিঘি আর অসংখ্য পুকুরের শহর ছিল চট্টগ্রাম। বর্ষার অতিরিক্ত পানি ধারণ করত প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বজায় রাখত, আবার নগরের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশেরও ভারসাম্য রক্ষা করত।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
টেকসই চট্টগ্রাম গড়তে পুকুর-জলাশয় রক্ষায় সিডিএর মহাপরিকল্পনা

কিন্তু গত কয়েক দশকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, আবাসন সম্প্রসারণ এবং প্রভাবশালীদের দখল-ভরাটের কারণে সেই জলাশয়গুলো একের পর এক হারিয়ে গেছে। এরই পরিণতিতে প্রতি বর্ষায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া এবং পরিবেশগত সংকট এখন নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী।

দীর্ঘদিনের এই বাস্তবতা সামনে রেখে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টার প্ল্যান (সিএমএমপি) ২০২৫-২০৫০-এর খসড়ায় পুকুর, দিঘি ও জলাশয় সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় প্রায় ৪০ হাজার পুকুর ও জলাশয় সংরক্ষণ, অবৈধ ভরাটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা, বড় জলাশয় অধিগ্রহণ, ড্রোন ও জিআইএস প্রযুক্তিতে নজরদারি এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে জলাশয়কে 'স্টোরেজ পন্ড' হিসেবে ব্যবহারের মতো যুগান্তকারী প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) নতুন মহানগর মহাপরিকল্পনার খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে। ২ আগস্ট থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬০ দিন নাগরিকদের মতামত, আপত্তি ও সংশোধনী গ্রহণের পর চূড়ান্ত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে।

সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. বেলায়েত হোসেন বলেছেন, অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে চট্টগ্রামের পাহাড়, খাল, নদী ও প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নতুন মহাপরিকল্পনার লক্ষ্য একটি পরিবেশবান্ধব, সবুজ, বাসযোগ্য এবং টেকসই চট্টগ্রাম গড়ে তোলা।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ শুধু অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ নয়; বরং প্রাকৃতিক জলাধারগুলোর ধারাবাহিক বিলুপ্তি। এক সময় যেসব পুকুর ও জলাশয় অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণ করত, সেগুলোর বড় অংশ এখন বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক স্থাপনা কিংবা আবাসিক প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। ফলে অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাশয় হারানোর আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর। বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশের সুযোগ কমে যাওয়ায় পানির স্তর ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে কমছে জীববৈচিত্র্য, বাড়ছে নগরের তাপমাত্রা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি।

সিডিএ সূত্র জানিয়েছে, পরিকল্পনাধীন এলাকায় ইতোমধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৬০০টি পুকুর ডিজিটাল ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তী ধাপে প্রায় ৪০ হাজার পুকুর, দিঘি ও অন্যান্য জলাশয়কে জিআইএসভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডারের আওতায় আনা হবে। প্রতিটি জলাশয়ের অবস্থান, আয়তন, মালিকানা, ব্যবহার এবং বর্তমান অবস্থা ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা হবে। ফলে কোনো জলাশয় ভরাট বা আয়তন পরিবর্তনের চেষ্টা হলে তা দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

মাস্টার প্ল্যানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বিএস মৌজা ম্যাপ, খতিয়ান এবং ২০০৮ সালের ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত সরকারি ও বেসরকারি সব পুকুর ও জলাশয় তাদের মূল আকৃতি ও আয়তন অক্ষুণ্ন রেখেই সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এসব জলাশয়ের আয়তন কমানো, ভরাট করা কিংবা পানির ধারণক্ষমতা নষ্ট করা যাবে না। মাঠ পর্যায়ে নতুন করে চিহ্নিত গুরুত্বপূর্ণ জলাশয়গুলোকেও সংরক্ষণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

পরিকল্পনায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং অর্ধ একরের বেশি আয়তনের জলাশয় প্রয়োজন হলে সিডিএ কিংবা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন অধিগ্রহণ করতে পারবে। এসব জলাশয়ের চারপাশে হাঁটার পথ, বসার স্থান, উন্মুক্ত সবুজ এলাকা এবং বিনোদন সুবিধা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জলাশয় শুধু সংরক্ষিতই হবে না, নগরবাসীও পাবে নতুন উন্মুক্ত জনপরিসর।

মাস্টার প্ল্যানে অবৈধভাবে জলাশয় দখল বা ভরাটকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যারা ব্যক্তিমালিকানাধীন জলাশয় সংরক্ষণ করবেন, তাদের জন্য ট্রান্সফার অব ডেভেলপমেন্ট রাইটস (টিডিআর), কর ছাড় এবং অন্যান্য আর্থিক প্রণোদনার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, শাস্তি ও প্রণোদনা—দুই ধরনের নীতিই একসঙ্গে প্রয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

জলাশয় রক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, জলাশয় ও খালের চারপাশে নির্দিষ্ট বাফার জোন গড়ে তুলে অবৈধ দখল ঠেকানো হবে। পাশাপাশি ড্রোন, সেন্সর ও আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারি চালিয়ে পানির গুণগত মান, আয়তনের পরিবর্তন এবং দখল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।

নগরের জলাবদ্ধতা কমাতে দুই হাজার বর্গমিটারের বেশি আয়তনের পুকুরগুলোকে 'স্টোরেজ পন্ড' হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভারী বর্ষণের সময় এসব জলাশয় অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণ করবে এবং ধীরে ধীরে তা নিষ্কাশন ব্যবস্থায় ছেড়ে দেবে। একই সঙ্গে প্রতিটি ড্রেনেজ এলাকায় কমপক্ষে তিন শতাংশ জলাভূমি সংরক্ষণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

মাস্টার প্ল্যানের তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনাধীন ১৭টি ড্রেনেজ জোনে বর্তমানে ৩ হাজার ৯৮৬ একর জলাশয় রয়েছে। এর মধ্যে ড্রেনেজ জোন-১৫-এ সবচেয়ে বেশি ৮৬৩ একর এবং ড্রেনেজ জোন-৩-এ সবচেয়ে কম ১৯ একর জলাশয় রয়েছে। পরিকল্পনায় এসব জলাশয় শতভাগ সংরক্ষণের সুপারিশ করা হয়েছে।

পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চট্টগ্রামে অতীতেও জলাশয় রক্ষায় বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা ছিল। কিন্তু দুর্বল তদারকি, প্রভাবশালীদের দখল এবং সমন্বয়ের অভাবে সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে পরিকল্পনা প্রণয়ন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি জরুরি হবে কঠোর বাস্তবায়ন, নিয়মিত নজরদারি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

তাদের মতে, নতুন মহাপরিকল্পনায় প্রস্তাবিত সংরক্ষণ নীতিগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে শুধু জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণই নয়, ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃভরণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায়ও গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সম্ভব হবে। বহু বছর ধরে দখল ও ভরাটের চাপে হারাতে বসা চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক জলাধারগুলো পুনরুদ্ধারের এ উদ্যোগ বাস্তবে রূপ পেলে একটি আরও বাসযোগ্য, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই মহানগর গড়ার পথে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • সিডিএ
  • জলাশয়
  • জলাবদ্ধতা

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন