মূল সংবাদে যান
শিক্ষা ও চিকিৎসা

এরিস্টোকেয়ার হাসপাতাল নাকি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন? ১৯ পিলারের অনুমোদন, নির্মাণ ১৭টি; ফ্ল্যাটের অনুমোদনে হাসপাতাল

চট্টগ্রামের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের অন্যতম আলোচিত প্রতিষ্ঠান এরিস্টোকেয়ার হাসপাতালকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
এরিস্টোকেয়ার হাসপাতাল নাকি ঝুঁকিপূর্ণ ভবন? ১৯ পিলারের অনুমোদন, নির্মাণ ১৭টি; ফ্ল্যাটের অনুমোদনে হাসপাতাল

সিডিএর প্রকৌশলগত মূল্যায়ন, আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করবে হাসপাতালটির ভবিষ্যৎ।

একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এখন চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে—অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ হয়েছে কি না, আদালতের নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ মানা হয়েছিল কি না, হাসপাতাল হিসেবে পরিচালনার প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না এবং পরিবেশগত শর্ত পূরণ না করেই কীভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছিল।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও পরিবেশ অধিদপ্তরের পৃথক অভিযানে উঠে আসা তথ্য বলছে, বিষয়টি শুধু একটি হাসপাতালের প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; এটি নগর পরিকল্পনা, জননিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং আইনের শাসনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।

সিডিএ ইতোমধ্যে হাসপাতালের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তর পরিবেশ সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘনের দায়ে দেড় লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ আরোপ করেছে এবং প্রয়োজনীয় পরিবেশগত শর্ত পূরণ ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা না করার নির্দেশ দিয়েছে।

নকশা এক, নির্মাণ আরেক

গত ৩০ জুলাই সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে হাসপাতালের ১০ তলা ভবনের অনুমোদিত নকশা ও বাস্তব নির্মাণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অসঙ্গতি ধরা পড়ে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অনুমোদিত নকশায় ভবনটিতে ১৯টি পিলার থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে নির্মাণ করা হয়েছে ১৭টি। এছাড়া অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত একটি লিফট সংযোজনের অভিযোগও পাওয়া গেছে।

কাঠামো প্রকৌশলীদের মতে, কোনো বহুতল ভবনের অনুমোদিত কাঠামো পরিবর্তন করা হলে তা ভবনের লোড বহনক্ষমতা, ভূমিকম্পে স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। হাসপাতালের মতো সার্বক্ষণিক জনসমাগমপূর্ণ ভবনের ক্ষেত্রে এমন অভিযোগ আরও গুরুতর।

ফ্ল্যাটের অনুমোদনে হাসপাতাল

সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন জানিয়েছেন, ভবনটি মূলত আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণের অনুমোদন নিয়ে তৈরি হলেও বর্তমানে সেখানে হাসপাতাল পরিচালিত হচ্ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, আবাসিক ভবনকে হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করতে হলে ব্যবহার পরিবর্তনের অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা, পর্যাপ্ত পার্কিং, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ, রোগী পরিবহন ব্যবস্থা, চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য কারিগরি মানদণ্ড পূরণ করা বাধ্যতামূলক। এসব শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা এখন যাচাই করছে সিডিএ।

আদালতের নির্দেশ উপেক্ষার অভিযোগ

হাসপাতালটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো উচ্চ আদালতের নির্দেশ অমান্য করে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ।

স্থানীয় বাসিন্দা শহীদ উল্লাহ ২০২৫ সালের ৪ জুন উচ্চ আদালতে আবেদন করলে একই বছরের ২৪ জুন আদালত ভবনের নির্মাণকাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেন।

অভিযোগ রয়েছে, ওই নির্দেশ কার্যকর থাকা অবস্থাতেই ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদালতের নির্দেশ অমান্য করা প্রমাণিত হলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; আদালত অবমাননার বিষয়ও হতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই কার্যক্রম

পরিবেশ অধিদপ্তরের তদন্তে উঠে এসেছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনিয়ম।

সংস্থাটির তথ্যমতে, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অবস্থানগত ছাড়পত্র গ্রহণ না করেই হাসপাতালটি চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করছিল।

গত ২৯ জুলাই পরিদর্শনের পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে শুনানিতে ডাকা হয়। শুনানিতে অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করার পর ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ আরোপ করা হয়।

একই সঙ্গে হাসপাতালকে বৈজ্ঞানিকভাবে তরল বর্জ্য পরিশোধন এবং পরিবেশগত শর্ত পূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রোগীদের জন্য কী ঝুঁকির?

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি হাসপাতালের নিরাপত্তা কেবল চিকিৎসক বা আধুনিক যন্ত্রপাতির ওপর নির্ভর করে না। ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন পথ, পার্কিং, বিদ্যুৎব্যবস্থা, অক্সিজেন লাইন, চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত অনুমোদন—সবকিছুই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এসবের যেকোনো একটিতে গুরুতর ঘাটতি থাকলে দুর্যোগের সময় রোগী ও স্বজনদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

সামনে যেসব প্রশ্ন-

ভবনটির কাঠামোগত নিরাপত্তা কি হাসপাতাল পরিচালনার জন্য যথেষ্ট? অনুমোদিত নকশা থেকে বিচ্যুতির দায় কার? আদালতের নির্দেশ কার্যকর থাকা অবস্থায় নির্মাণকাজ কীভাবে চলল? হাসপাতাল পরিচালনার আগে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অনুমোদন কেন নেওয়া হয়নি? নগরীর অন্য বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও কি একই ধরনের অনিয়ম রয়েছে?

এরিস্টোকেয়ার হাসপাতালকে ঘিরে উদ্ভূত ঘটনাপ্রবাহ এখন কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের অনুসন্ধান নয়; এটি নগর উন্নয়ন, ভবন নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা যাচাইয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • এরিস্টোকেয়ার হাসপাতাল

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন