সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকেল পর্যন্ত চলা এসব সংঘর্ষে সাংবাদিকসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি), বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি), ঢাকা কলেজ এবং সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মঙ্গলবার দুপুরে কেন্দ্রীয় মিলনায়তনের সামনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানের আগমনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। সংঘর্ষ ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সাংবাদিক রজব আল ফাহিম, দ্য ডেইলি স্টারের রাকিবুল ইসলাম, ঢাকা ট্রিবিউনের সোহায়েল আহমেদসহ অন্তত ছয় সাংবাদিক হামলার শিকার হন।
এ ঘটনায় জবি ছাত্রশিবির সভাপতি আব্দুল আলিম আরিফ, জকসুর এজিএস মাসুদ রানা, ছাত্রফ্রন্ট সভাপতি ইভান তাহসিবসহ অন্তত ২২ জন আহত হন।
ঘটনার পর জবি ছাত্রফ্রন্ট এক বিবৃতিতে শিবিরের ‘দখলদারির মানসিকতা’ এবং ছাত্রদলের ‘ন্যাক্কারজনক হামলার’ অভিযোগ তোলে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক নাসির উদ্দীন ঘটনার পেছনে ‘জুলাইবিরোধী শক্তি বা ছাত্রলীগের’ সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার কথা উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, সোমবার সন্ধ্যায় বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবিরের আয়োজিত ‘জুলুমের বিরুদ্ধে জুলাই’ শীর্ষক প্রদর্শনীর ছবি সরানোকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে অন্তত ২৫ জন শিক্ষার্থী আহত হন।
এর জেরে মঙ্গলবার বিকেলে আবু সাঈদ চত্বরে উভয় সংগঠন পাল্টাপাল্টি সমাবেশের ঘোষণা দিলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সম্ভাব্য সংঘাত এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাসে সব ধরনের যানবাহন ও দর্শনার্থী প্রবেশ নিষিদ্ধ করে। একই সঙ্গে তাজহাট থানার কাছে ১৪৪ ধারা জারির আবেদন করা হয়।
তবে তাজহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম জানান, পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করা হয়নি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার প্রভাব পড়ে রাজধানীর ঢাকা কলেজেও। মঙ্গলবার বেলা তিনটার দিকে কলেজ অডিটোরিয়ামের সামনে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা মুখোমুখি অবস্থান নিলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ২০ জন আহত হন।
কলেজ শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মিলাদ হোসেন অভিযোগ করেন, তাদের পূর্বনির্ধারিত কর্মীসভায় বহিরাগতদের নিয়ে হামলা চালিয়েছে ছাত্রশিবির এবং ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে।
অন্যদিকে, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, শহীদদের স্মরণে আয়োজিত তাদের দোয়া মাহফিলে ছাত্রদল বিনা উসকানিতে হামলা চালিয়েছে।
রমনা বিভাগের উপকমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, পুলিশ দুই পক্ষের মাঝখানে অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।
এদিকে মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বকশীবাজারে সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন আহত হন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (চকবাজার জোন) মো. মাহফুজার রহমান জানান, পুলিশ উপস্থিত থাকলেও উভয় পক্ষের নেতাকর্মীরা ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষে অংশ নেওয়া অনেকের হাতে লোহার পাইপ ও লাঠি ছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতেও দেশীয় অস্ত্র হাতে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেন।
একই দিনে দেশের চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের ঘটনায় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা, শিক্ষার পরিবেশ এবং ছাত্ররাজনীতির সহিংসতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ক্যাম্পাসগুলোতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
