মূল সংবাদে যান
অপরাধ

চট্টগ্রামের নতুন আতঙ্ক ১৩ হত্যা মামলার আসামি ‘রায়হান’

চট্টগ্রামের অপরাধ জগতে একের পর এক হত্যাকাণ্ড, ভারী অস্ত্রের প্রকাশ্য ব্যবহার এবং পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে বেড়ানো—এসব কারণে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান (৩৫)।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
চট্টগ্রামের নতুন আতঙ্ক ১৩ হত্যা মামলার আসামি ‘রায়হান’

নগর ও জেলায় হত্যা, জোড়া খুন, অস্ত্র ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ ১৩টি মামলার আসামি এই রায়হানকে ঘিরে পুলিশের অভিযান, সোর্স হত্যার ঘটনা এবং সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্য নতুন করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাউজানের দক্ষিণ-পূর্ব রাউজান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জুরুরকূল মুন্দার খলিফার বাড়ির বাসিন্দা বদিউল আলমের ছেলে রায়হান বর্তমানে বিদেশে অবস্থানকারী শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে বাকলিয়ার জোড়া খুন, বায়েজিদে সরওয়ার হত্যা, পতেঙ্গায় ঢাকাইয়া আকবর হত্যা, রাউজানে মাকসুদ ও ইব্রাহিম হত্যাসহ একাধিক আলোচিত মামলার অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২১ এপ্রিল রাতে রাউজানে রায়হানকে গ্রেপ্তারে নগর পুলিশের একটি বিশেষ দল অভিযান চালায়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ তার অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছালেও শেষ মুহূর্তে তিনি পালিয়ে যান।

অভিযানে অংশ নেওয়া এক পুলিশ সদস্যের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের তথ্য যিনি পুলিশকে দিয়েছিলেন, পরদিন দুপুরেই তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর থেকে রায়হানকে ধরতে তেমন বড় ধরনের অভিযান আর পরিচালিত হয়নি।

নিহত যুবকের নাম মো. ইব্রাহিম (২৬)। তিনি রাউজানের শমসের নগর আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। ইব্রাহিম হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল দুপুরে রাউজানের গাজীপাড়া এলাকায় তিনটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে রায়হান ও তার সহযোগীরা ঘটনাস্থলে এসে ইব্রাহিমকে ঘিরে ফেলে। পরে তাকে মারধরের পর মাথা, পিঠ, কোমর ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলি করে হত্যা করা হয়।

এই ঘটনায় রায়হানসহ আটজনকে আসামি করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত মামলার একমাত্র গ্রেপ্তার হওয়া আসামি ধামা ইলিয়াছ। অন্যরা এখনও পলাতক।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাসুদ আলম জানান, গত ৫ জুলাই শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের সময় একই সঙ্গে রায়হানকে ধরতেও নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে অভিযান চালানো হয়েছিল।

তিনি বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের একটি দল সেখানে অবস্থান করছিল। কিন্তু ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ হওয়ার পর রায়হান সতর্ক হয়ে বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যায়। তবে তার গ্রুপ এখন অনেকটাই ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে বলে দাবি পুলিশের।

জেলা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদে রায়হান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশের দাবি, সম্প্রতি রায়হান প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি কিনেছেন। পাশাপাশি পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ভারী অস্ত্র সংগ্রহ করেছে তার গ্রুপ। যদিও এসব তথ্যের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানায়নি পুলিশ।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কারাগারে হত্যাচেষ্টার একটি মামলায় থাকা অবস্থায় রায়হানের সঙ্গে পরিচয় হয় বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দুজনই জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় অপরাধচক্র সক্রিয় করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে সাজ্জাদ আবার কারাগারে গেলে তার অস্ত্রভাণ্ডার ও বাহিনীর একটি অংশের দায়িত্ব নেন রায়হান।

পুলিশের দাবি, বর্তমানে বায়েজিদ, পাঁচলাইশ, চান্দগাঁও, পতেঙ্গা, হাটহাজারী ও রাউজানসহ বিভিন্ন এলাকায় সাজ্জাদ বাহিনীর কার্যক্রম পরিচালনায় রায়হান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রায়হানের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া উল্লেখযোগ্য মামলাগুলোর মধ্যে রয়েছে—বাকলিয়ায় জোড়া খুন, বায়েজিদে সরওয়ার হত্যা, পতেঙ্গায় ঢাকাইয়া আকবর হত্যা, রাউজানে মাকসুদ হত্যা, ইব্রাহিম হত্যা, অস্ত্র ও চাঁদাবাজিসহ আরও একাধিক মামলা।

গত ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে প্রকাশ্যে গুলিতে নিহত আকবর আলী ওরফে ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাতেও রায়হানকে আসামি করা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর আকবর নিজেই হামলাকারী হিসেবে রায়হানের নাম উল্লেখ করেছিলেন।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, রায়হানকে গ্রেপ্তার করা এখন তাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। তবে ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তন, সংঘবদ্ধ সশস্ত্র সহযোগী এবং আন্তঃজেলা নেটওয়ার্কের কারণে অভিযান জটিল হয়ে উঠছে।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযানে কয়েকজন গ্রেপ্তার হলেও পলাতক সশস্ত্র অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা না গেলে নগর ও জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য তা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন