মূল সংবাদে যান
শিক্ষা ও চিকিৎসা

খাবারের সঙ্গে প্রতিদিনই প্লাস্টিক, নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকির’ মুখে বাংলাদেশ!

খালি চোখে দেখা যায় না। স্বাদ-গন্ধও নেই। তবু প্রতিদিনের খাবারের সঙ্গে অজান্তেই মানুষের শরীরে ঢুকে পড়ছে হাজার হাজার অতিক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
খাবারের সঙ্গে প্রতিদিনই প্লাস্টিক, নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকির’ মুখে বাংলাদেশ!

সয়াবিন তেল, চিনি, দুধ—বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত তিনটি খাদ্যপণ্যের ওপর পরিচালিত পৃথক তিনটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে একই উদ্বেগজনক চিত্র। পরীক্ষিত প্রায় প্রতিটি নমুনাতেই মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি।

বিজ্ঞানীদের মতে, এটি কেবল পরিবেশ দূষণের বিষয় নয়; বরং জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নীরব সংকট। এখনো এসব কণার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা চলমান থাকলেও আন্তর্জাতিক গবেষণায় ইতোমধ্যে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং হৃদ্‌রোগসহ নানা জটিলতার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছে।

সয়াবিন তেলে প্রতি লিটারে ৫৩ হাজারের বেশি প্লাস্টিক কণা

সবচেয়ে উদ্বেগজনক ফল এসেছে সয়াবিন তেলের গবেষণায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) পরিবেশবিজ্ঞানীদের যৌথ গবেষণায় ঢাকার তেজগাঁও, উত্তরা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে সংগ্রহ করা বোতলজাত ও খোলা—মোট ৬০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

ফলাফলে দেখা যায়, প্রতিটি নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। প্রতি লিটার তেলে গড়ে পাওয়া গেছে ৫৩ হাজার ৯২২টি কণা। বোতলজাত তেলে যেখানে গড়ে ছিল ৪৮ হাজার ৬৭টি, সেখানে খোলা তেলে পাওয়া গেছে ৫৯ হাজার ৭৭৮টি কণা—অর্থাৎ প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি।

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Journal of Food Composition and Analysis-এ প্রকাশিত গবেষণায় ছয় ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮২.৫ শতাংশ ছিল ফাইবার বা আঁশজাতীয় কণা এবং ৫৬.২৯ শতাংশ ছিল স্বচ্ছ প্লাস্টিক।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এলসেভিয়ারে প্রকাশিত আরেক গবেষণাতেও তেজগাঁও এলাকার খোলা তেলে সর্বোচ্চ দূষণের তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষকদের মতে, প্লাস্টিকের পাত্র পুনঃব্যবহার, খোলা তেল সংরক্ষণে অনিয়ম, উৎপাদন ও প্যাকেজিং প্রক্রিয়া এবং শিল্পাঞ্চলের বায়ুদূষণ—এসবই দূষণের সম্ভাব্য উৎস।

চিনির ৯৫ শতাংশ নমুনায় মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক

নিত্যদিনের চায়ের কাপেও থাকছে প্লাস্টিকের কণা। গবেষক সাদিয়া আফরিন, নায়ন হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমান পরিচালিত গবেষণায় ঢাকার বাজার থেকে সংগৃহীত সাত ধরনের ব্র্যান্ডেড ও খোলা চিনির নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়।

ফলাফলে দেখা যায়, ৯৫ শতাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। প্রতি কেজি চিনিতে পাওয়া গেছে ২১০ থেকে ৫০৮টি কণা। ব্র্যান্ডেড চিনিতে গড়ে ৩২২টি এবং খোলা চিনিতে ৪০৩টি কণা শনাক্ত হয়েছে।

গবেষকদের মতে, উৎপাদন, পরিশোধন, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং প্যাকেজিংয়ের প্রতিটি ধাপ থেকেই প্লাস্টিক কণা খাদ্যে প্রবেশ করতে পারে।

শিশুর সবচেয়ে নিরাপদ খাদ্যও দূষণের বাইরে নয়

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে দুধের গবেষণা। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সানাউল্লাহ মজুমদারের নেতৃত্বে পরিচালিত এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অর্থায়নে সম্পন্ন গবেষণায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত কাঁচা দুধ, তরল দুধ ও গুঁড়া দুধসহ মোট ৪১টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

প্রতিটি নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।

গড়ে প্রতি ১০০ মিলিলিটার ব্র্যান্ডেড দুধে পাওয়া গেছে ১৫৬.৬টি, কাঁচা দুধে ৯৩.৩৯টি এবং অন্যান্য দুগ্ধজাত পণ্যে ৭০.৮০টি কণা।

গবেষকদের মতে, দুধ সংগ্রহ, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্যাকেটজাতকরণের বিভিন্ন ধাপেই এই দূষণ ঘটতে পারে।

কোন ধরনের প্লাস্টিক মিলছে?

তিনটি গবেষণাতেই পলিইথিলিন (PE), পলিপ্রোপিলিন (PP), পিইটি (PET), পিভিসি (PVC), নাইলন, পলিইউরেথেন ও টেফলনসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক পলিমার শনাক্ত হয়েছে।

এসব কণার উৎস হতে পারে কৃত্রিম তন্তুর পোশাক, প্লাস্টিক পাইপ, ফিল্টার, যন্ত্রপাতি, প্যাকেজিং উপকরণ কিংবা বাতাসে ভেসে থাকা প্লাস্টিক ধুলিকণা।

বছরে শরীরে ঢুকছে হাজারো কণা

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, শুধু সয়াবিন তেল থেকেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের শরীরে বছরে প্রায় ৬ হাজার ৪৪১টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা প্রবেশ করতে পারে। এর সঙ্গে চিনি ও দুধ থেকে আসা কণা যোগ হলে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি, কারণ তাদের খাদ্যতালিকায় দুধের পরিমাণ বেশি থাকে।

চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট রোগ সৃষ্টি করে—এমন প্রমাণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। তবে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘদিন এসব কণা শরীরে জমতে থাকলে প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, হরমোনের কার্যক্রমে ব্যাঘাত, হৃদ্‌রোগ, অন্ত্রের প্রদাহ, প্রজননস্বাস্থ্যের সমস্যা এবং স্নায়ুতন্ত্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আদালত নড়েছে টুথপেস্টে, খাদ্যে এখনো নীরবতা

পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও)-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় বাজারের ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার তথ্য প্রকাশের পর হাইকোর্ট তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

তবে তেল, চিনি ও দুধের মতো প্রতিদিনের খাদ্যপণ্যে একই ধরনের দূষণের প্রমাণ মিললেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো বড় নিয়ন্ত্রক বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

তদারকি নিয়ে প্রশ্ন

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, যেসব খাদ্যপণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে, সেগুলো বাজারজাত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকির মধ্য দিয়েই এসেছে। ফলে বর্তমান মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

তিনি দূষণের অভিযোগ পাওয়া খাদ্যপণ্য পুনরায় পরীক্ষা, ঝুঁকি নিশ্চিত হলে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং উৎপাদন ও প্যাকেজিং প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

কী করা প্রয়োজন

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ প্রয়োজন—

খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের জাতীয় মানদণ্ড ও পরীক্ষার পদ্ধতি প্রণয়ন। বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিয়মিত নজরদারি জোরদার করা। উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্যাকেজিংয়ে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো। খোলা খাদ্যপণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি ও সংরক্ষণব্যবস্থা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন। দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিরূপণে জাতীয় পর্যায়ে গবেষণা সম্প্রসারণ। নীরব সংকট, এখনই সতর্ক হওয়ার সময়

মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন আর শুধু নদী, সাগর কিংবা বাতাসের দূষণের বিষয় নয়; এটি মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রবেশ করেছে। তেল, চিনি ও দুধের মতো মৌলিক খাদ্যে এ দূষণের উপস্থিতি খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কসংকেত। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখনই কার্যকর নীতি, কঠোর তদারকি এবং জনসচেতনতা গড়ে তোলা না গেলে ভবিষ্যতে এই অদৃশ্য দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • মাইক্রোপ্লাস্টিক

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন