সংঘবদ্ধ চোরাচালান চক্রের আরও এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট|
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এই চক্রটি চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অনলাইন কাস্টমস ব্যবস্থায় অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করে সরকারি নথি জালিয়াতির মাধ্যমে অন্তত ১০ থেকে ১২ কোটি টাকার রাজ¯^ ফাঁকির অপচেষ্টা চালিয়েছিল| সর্বশেষ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির বিরুদ্ধে কাস্টমসের সার্ভারে প্রবেশ, অন্য কর্মকর্তার ইউজার আইডি ব্যবহার, পাসওয়ার্ড পরিবর্তন এবং প্রতারণামূলক কাস্টমস কার্যক্রমে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে|
শুক্রবার (১৭ জুলাই) সিএমপি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ এসব তথ্য জানান|
মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া শেখ সেজান (২৬) নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার বাসিন্দা| গত ১৫ জুলাই নেপালে পালিয়ে যাওয়ার সময় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভিবাসন পুলিশের সহায়তায় তাকে আটক করা হয়|
পুলিশের তথ্যমতে, সংঘবদ্ধ চক্রটি চীন থেকে বন্ড সুবিধায় শুল্কমুক্ত কাপড় আমদানির ভুয়া ঘোষণা দিয়ে একটি কনটেইনারে ১১ হাজার ৬৭৬ লিটার বিদেশি মদ এবং অপর একটি কনটেইনারে ৫০ লাখ শলাকা বিদেশি সিগারেট দেশে আনার চেষ্টা করে| এভাবে বিপুল পরিমাণ রাজ¯^ ফাঁকি দিয়ে পণ্য খালাসের পরিকল্পনা ছিল তাদের|
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, চক্রটি জাল এলসি ˆতরি করে জাতীয় রাজ¯^ বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে অবৈধভাবে প্রবেশ করে কনটেইনার খালাসের কার্যক্রম সম্পন্ন করার চেষ্টা করে| প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শেখ সেজান কাস্টমস ও বন্দরের সার্ভারে অবৈধ অনুপ্রবেশ, অন্যের ইউজার আইডি ব্যবহার, পাসওয়ার্ড পরিবর্তন এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার কথা ¯^ীকার করেছেন বলে দাবি পুলিশের| তার বক্তব্য আগে গ্রেপ্তার হওয়া আসামি আশরাফ হোসেন রাজুর আদালতে দেওয়া জবানবন্দির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও জানানো হয়|
ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, ২০২৪ সালের ২০ মে একটি মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করে কাস্টমসের এক কর্মকর্তার ব্যবহারকারী পরিচিতিতে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করা হয়| এরপর সেই আইডি ব্যবহার করে বিদেশি সিগারেট আমদানির এলসি নিবন্ধন ও চালুর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল|
পুলিশ জানায়, শেখ সেজানকে গ্রেপ্তারের জন্য এর আগে নড়াইলে তার বাড়িতে অভিযান চালানো হলে তিনি পালিয়ে যান| তবে সেখান থেকে একটি স্যামসাং ব্র্যান্ডের মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়| প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, ওই মোবাইল থেকেই কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে অনুপ্রবেশ করে এলসি নিবন্ধন ও চালুর কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিল|
সিএমপির তথ্য অনুযায়ী, শেখ সেজান এর আগেও সরকারি বিভিন্ন জনসেবামূলক ওয়েবসাইটের নকল সংস্করণ ˆতরি, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ, টিকা সনদসহ বিভিন্ন সরকারি ডিজিটাল সেবার জালিয়াতির অভিযোগে সিএমপি ও ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন| তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় সাতটি সাইবার অপরাধ ও প্রতারণার মামলা রয়েছে|
এই ঘটনায় দায়ের হওয়া দুটি মামলায় এর আগে সিএন্ডএফ প্রতিষ্ঠান হাফেজ ট্রেডিং প্রাইভেট লিমিটেডের চেয়ারম্যান খালেদ হোসেন মামুন, পরিচালক বাকির হোসেন, কর্মচারী খোরশেদ আলম রিপন ও মিজান, এবং চক্রের সদস্য আশরাফ হোসেন রাজু, খায়েজ আহমেদ ওরফে আরিফ ও বড় রাজুসহ মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে| কাস্টমসের ডিজিটাল সিস্টেম ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চোরাচালান ও রাজ¯^ ফাঁকির সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে|
ঘটনাটি শুধু চোরাচালানের নয়; এটি দেশের কাস্টমসের ডিজিটাল অবকাঠামোর নিরাপত্তা, রাজ¯^ ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্যও একটি গুরুতর সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে| তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কাস্টমসের অভ্যন্তরে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততা ছিল কি না, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো|
