নিজ বাড়ি কুমিল্লায় হলেও নগরের পূর্ব মাদারবাড়িতে বেড়ে ওঠা শাহ আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ—জোট সরকারের সময় দুবাই ফেরত পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘রেলখোকো’ হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও ভারতে পলাতক সুনীলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে তিনি রেলওয়ের প্রভাবশালী মহলে প্রবেশ করেন। এরপর থেকেই রেলের টেন্ডার, ইজারা ও দখল বাণিজ্যে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার শুরু হয় তার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রেলের বড় বড় টেন্ডার, ট্রেনে খাবার সরবরাহ, স্টেশনভিত্তিক দোকান ইজারা, পার্কিং, গেস্টহাউস, এমনকি রেলভূমিতে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ—সবখানেই রয়েছে শাহ আলম সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ। তার স্ত্রী ইয়াসমিন আলমের নামে রেলভূমিতে পরিচালিত হচ্ছে ‘তাসফিয়া গার্ডেন’ নামে একটি রেস্টুরেন্টও।
‘তাসফিয়া গার্ডেন’ ঘিরে অভিযোগ
চট্টগ্রাম রেলওয়ে হাসপাতালের প্রধান ফটকের দক্ষিণ পাশে সিআরবি এলাকায় প্রায় ৬ হাজার বর্গফুট রেলভূমির ওপর নির্মিত হয়েছে ‘তাসফিয়া গার্ডেন’। অভিযোগ উঠেছে, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়াই লাইসেন্স নিয়ে রেস্টুরেন্টটি গড়ে তোলা হয়েছে। যদিও লাইসেন্স ইয়াসমিন আলমের নামে, স্থানীয়দের দাবি—সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন শাহ আলম নিজেই।
এ ঘটনায় চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মো. জাফর হায়দার রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের পর ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপককে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, ওই স্থানে সরকারি হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু রেস্টুরেন্ট উচ্ছেদের আশঙ্কায় শাহ আলমের লোকজন ‘পেইড’ কর্মসূচি ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনে চাপ সৃষ্টি করে। এছাড়া রেস্টুরেন্টে উচ্চ শব্দে গান-বাজনা ও অনুষ্ঠান আয়োজনের কারণে পাশের হাসপাতালের রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আইস ফ্যাক্টরি রোডে ‘শাহ আমানত রেলওয়ে সুপার মার্কেট’
২০১৮ সালের শেষ দিকে আইস ফ্যাক্টরি রোড এলাকায় রেলের কাছ থেকে এক বছরের জন্য প্রায় ২ দশমিক ৩ একর জমি লিজ নেয় আইস ফ্যাক্টরি রোড ব্যবসায়ী সমিতি ও চুনারগুদাম ট্রাক মালিক সমবায় সমিতি। দুটি সমিতির সভাপতি জহির আহমদ চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শাহ আলম।
অভিযোগ রয়েছে, ৩৯ লাখ ১৮০ টাকায় লিজ নেওয়া জমির বাইরে আরও প্রায় ১ দশমিক ৬৮ একর জমি দখল করে সেখানে ‘শাহ আমানত রেলওয়ে সুপার মার্কেট’ নির্মাণ করা হয়। মার্কেটের ২৭০টি দোকান দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির নামে ১৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সালামিতে বিক্রি করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন একাধিক ব্যবসায়ী। এতে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
তবে বিষয়টি অস্বীকার করেননি শাহ আলম। বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, লিজের শর্ত মেনেই মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে এবং ক্রেতাদের আগেই জানানো হয়েছিল জমিটি এক বছরের লিজে নেওয়া।
স্টেশন, পার্কিং, গেস্টহাউস—সবখানেই নিয়ন্ত্রণ
অভিযোগ রয়েছে, চট্টগ্রাম পুরোনো রেলস্টেশনের হোটেল হেরিটেজ প্রায় এক দশক ধরে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন শাহ আলম। নতুন রেলস্টেশনের প্রায় এক হাজার গাড়ি ধারণক্ষমতার পার্কিংও ছয় বছর ধরে তার নিয়ন্ত্রণে। নতুন স্টেশনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার গেস্টহাউস পরিচালনাও শাহ আলম সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া নতুন স্টেশন এলাকায় প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার বর্গফুটের দুটি পার্কিংয়ের লিজের মেয়াদ শেষ হলেও মামলার আড়ালে তা এখনো দখলে রাখার অভিযোগ রয়েছে। হালিশহরে রেলের প্রায় ১২ একর জলাশয় ইজারা নিয়ে সেখানে বিলাসবহুল বাগানবাড়ি নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
ভুয়া অভিজ্ঞতায় কোটি টাকার কাজ
রেলের নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শাহ আলমের মালিকানাধীন এসএ করপোরেশন ও ইউনিক ট্রেডার্স ছাড়াও নওফেল আহমেদের হাইটেক কনস্ট্রাকশন এবং বেলাল হুজুর পরিচিত মো. বিল্লাল হোসেনের মোহাম্মদী ইঞ্জিনিয়ারিং ও ইউনিকন লিমিটেড—এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত।
অভিযোগ রয়েছে, ২০১৯ সালের আগে এসব প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য নির্মাণ অভিজ্ঞতা না থাকলেও পরবর্তী সময়ে ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেওয়া হয়। এমনকি রেল সচিবালয় ভবন ও পদ্মা রেল লিংক প্রকল্পের মতো স্পর্শকাতর প্রকল্পেও কাজ পেয়েছে এই সিন্ডিকেটভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো।
রেলওয়ের একটি ডিভিশনের চুক্তিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, সিন্ডিকেটভুক্ত ছয়টি প্রতিষ্ঠান গত দুই বছরে ঢাকার অন্তত ১১টি প্রকল্পের কাজ পেয়েছে। এর মধ্যে রেল সচিবালয় ভবনের ৯ম ও ১০ম তলার ১৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকার কাজও রয়েছে। অভিযোগ আছে, অসৎ কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় এ প্রকল্পের বরাদ্দ আরও বাড়িয়ে ৩৩ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
‘কমিশন বাণিজ্যের’ অভিযোগ
রেলওয়ের একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, শাহ আলমের অনুমতি ছাড়া কেউ টেন্ডার জমা দেওয়ার সাহস করেন না। কেউ প্রতিযোগিতায় নামলে তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। অভিযোগ রয়েছে, কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ঠিকাদারদের কাছ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এই কমিশনের একটি অংশ রেলের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। কাজভেদে ২ থেকে ৫ শতাংশ প্রধান প্রকৌশলী, ২ শতাংশ জেনারেল ম্যানেজার এবং ১ শতাংশ ডিভিশনাল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দুদকের নজরে শাহ আলম
চট্টগ্রামে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি সূত্র জানিয়েছে, আইস ফ্যাক্টরি রোডের জমি কম মূল্যে ইজারা দেওয়া এবং নীতিমালা ভেঙে মার্কেট নির্মাণের ঘটনায় মামলা হয়েছে, যা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “শাহ আলমের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়ে অনেক অভিযোগ জমা পড়েছে। নিয়ম না মেনে যেসব কাজ হয়েছে, সেগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”
তবে এত অভিযোগ, তদন্ত ও মামলার পরও শাহ আলম সিন্ডিকেট এখনো বহাল তবিয়তে রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ ইজারা, টেন্ডার ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে—এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মহলের।
