চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) রোড সেফটি সেল গঠন এবং রোড ক্র্যাশের তথ্য সংগ্রহে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) প্রণয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে, যা সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করছে। বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) সিএমপি ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত চট্টগ্রাম সিটি রোড সেফটি রিপোর্ট-২০২৫-এ এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে নগরীর বর্তমান ও অতীত সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়েছে। এতে দুর্ঘটনার ধরণ, প্রবণতা এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর মানচিত্রও উপস্থাপন করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। পরবর্তীতে ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রাণহানির সংখ্যা প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও এটি নগরীর সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার স্থায়ী দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তোলে।
প্রতিবেদন বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে চট্টগ্রাম নগরীর সড়কে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন পথচারীরা। এই সময়ে নিহত পথচারীর সংখ্যা ৩৬৩ জন, যা মোট নিহতের অর্ধেকেরও বেশি। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সময়ে পথচারী মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে ৪৩ শতাংশ। পথচারীদের পর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ছিলেন দুই ও তিন চাকার যানবাহনের চালক ও যাত্রীরা। এই শ্রেণিতে নিহত হয়েছেন ১৯৫ জন।
রোড ক্র্যাশ প্রতিরোধে প্রতিবেদনে নগরীর ২০টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—বড়পোল মোড়, অলংকার মোড়, সিইপিজেড গেট, সিটি গেট, নিউমার্কেট বাসস্টপ, কালামিয়া বাজার বাসস্টপ এবং সাগরিকা গোলচত্বর। এসব স্থানে দ্রুত বিজ্ঞানভিত্তিক যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে ত্রুটি চিহ্নিত করে পুনর্নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তথ্যভিত্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে নগরীর সড়কে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বিশেষ করে পথচারী নিরাপত্তা নিশ্চিতে ফুটপাত প্রশস্তকরণ, উঁচু জেব্রা ক্রসিং নির্মাণ, নিরবচ্ছিন্ন ফুটপাত নিশ্চিতকরণ, স্পিড হাম্প স্থাপন এবং পথচারী দ্বীপ নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মোটরযান গতিসীমা নির্দেশিকাু২০২৪ কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
প্রতিবেদন প্রকাশনা অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশন) মো. হুমায়ূন কবির বলেন, সড়ক নিরাপত্তা শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি নগর পরিকল্পনা ও সড়ক নকশার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিএমপি রোড সেফটি সেল গঠন এবং রোড ক্র্যাশের তথ্য সংগ্রহে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) প্রণয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে, যা সড়ক নিরাপত্তা কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করছে।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী বলেন, সিএমপির গঠিত রোড সেফটি সেল ভবিষ্যতে নিয়মিতভাবে রোড ক্র্যাশের তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন প্রস্তুতের দায়িত্ব পালন করবে। এসব প্রতিবেদন নীতিনির্ধারক, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও নগর পরিকল্পনাবিদদের জন্য দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।
চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমান সোহেল জানান, প্রতিবেদনের সুপারিশকে ভিত্তি করে সিএমপির সঙ্গে যৌথভাবে চট্টগ্রাম শহরের সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম উইমেন্স কলেজ এলাকায় সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া বিআইজিআরএসের অংশীদার ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট (ডব্লিউআরআই) প্রদত্ত নকশার ভিত্তিতে পাহাড়তলী গার্লস স্কুল ও কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকায় সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের ব্যয় নিরূপণের কাজ চলছে।
ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিসের ইনিশিয়েটিভ ফর গ্লোবাল রোড সেফটি (বিআইজিআরএস) কর্মসূচির আওতায় চট্টগ্রাম সিটি রোড সেফটি রিপোর্টু২০২৫ প্রস্তুত ও প্রকাশে সহায়তা করেছে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংস্থা ভাইটাল স্ট্যাটেজিস। বিশ্বব্যাপী ২৭টি শহর ও ২টি রাজ্যে চলমান এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী শহরগুলোর একটি চট্টগ্রাম।
নগরীর দামপাড়া পুলিশ লাইনের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত প্রতিবেদন প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম ও অপারেশন) মো. হুমায়ূন কবির। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) ওয়াহিদুল হক চৌধুরী এবং চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমান সোহেল।
