মূল সংবাদে যান
অপরাধ

এলবার্ট সরকার ও সহযোগীদের এনআইডি ব্লকের নির্দেশ

চট্টগ্রাম নগরীর আলকরণ এলাকায় শত কোটি টাকার সরকারি অর্পিত সম্পত্তি জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত এলবার্ট সরকার ও তার সহযোগীদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) আগামী ৬ মাসের জন্য ব্লক করার আদেশ দিয়েছেন আদালত।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
এলবার্ট সরকার ও সহযোগীদের এনআইডি ব্লকের নির্দেশ

একই সঙ্গে উক্ত সম্পত্তি হস্তান্তরেও ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। বুধবার (১২ নভেম্বর) চট্টগ্রামের মহানগর সিনিয়র স্পেশাল জজ (মহানগর দায়রা জজ) মো. হাসানুল ইসলাম এ আদেশ দেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদক সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এর উপপরিচালক সুবেল আহমেদ। ইহুদি মালিকের সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগ।

তদন্তে জানা যায়, কোতোয়ালী থানার জিপিওর বিপরীতে আলকরণ রোডের মুখে অবস্থিত প্রায় ৭০ শতক ভূমির মালিক ছিলেন চট্টগ্রামে ব্যবসা করা ইহুদি নাগরিক ডেভিড ইজিক্যাল। দেশভাগের আগেই তিনি ও তার পরিবার চট্টগ্রাম ত্যাগ করলে জমিটি সরকারি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা এলবার্ট সরকার জাল মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশ সনদ, এমনকি কবর সনদ তৈরি করে ডেভিড ইজিক্যালকে খ্রিষ্টান হিসেবে দেখিয়ে নিজেকে তার ওয়ারিশ দাবি করেন। এসব ভুয়া নথি আদালতে প্রদর্শন করে তিনি রায় ও ডিক্রি হাসিল করেন এবং মূল্যবান এই সরকারি সম্পত্তির দখল নেন।

এলবার্ট সরকারের দাখিলকৃত কাগজপত্র সত্য ধরে নিয়ে ২০১৯ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ও ৬ অক্টোবর আদালত রায়, ডিক্রি প্রদান করেন। উক্ত রায়, ডিক্রির বিরুদ্ধে সরকার পক্ষ অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আপিল ট্রাইব্যুনাল, চট্টগ্রামে আপিল মামলা রুজু করে। আদালত ২০২২ সালের ৩১ অক্টোবর ও ৬ নভেম্বর রায়, ডিক্রি মূলে উক্ত আপিল না মঞ্জুর করেন অর্থাৎ নিম্ন আদালতের রায়, ডিক্রি বহাল রাখেন। এরই প্রেক্ষিতে নামজারি খতিয়ান নং ২৫-৯১৫ সৃজন করে জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম উল্লিখিত সম্পত্তি অবমুক্ত করে ও উক্ত সম্পত্তির লিজ গ্রহীতাদের উচ্ছেদ করে বাদী এলবার্ট সরকারকে চলতি বছরের ৫ মার্চ সম্পত্তির দখল বুঝিয়ে দেয়।

দুদকের অনুসন্ধানে জালিয়াতি প্রমাণিত। ঘটনা নজরে এলে ১৯ মার্চ দুদক তদন্ত শুরু করে। তদন্ত শেষে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে এলবার্ট সরকারের করা আত্মসাৎ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত বলে উল্লেখ করা হয়। এদিকে দুদকের কাছে তথ্য আসে যে, অবমুক্ত হওয়া সম্পত্তি বিক্রি বা হস্তান্তরের চেষ্টা চলছে। এ পরিস্থিতিতে দুদক আদালতে নিষেধাজ্ঞার আবেদন করে এবং আদালত তা মঞ্জুর করেন।

একইসঙ্গে এলবার্ট সরকার ও তার সহযোগীরা এনআইডির তথ্য পরিবর্তনের অপচেষ্টা চালাচ্ছেন—দুদকের এমন আবেদনের ভিত্তিতে আদালত তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রও ব্লক করার নির্দেশ দেন। এ আদেশ বাস্তবায়ন করবেন জেলা প্রশাসক, জেলা রেজিস্ট্রার, জেলা নির্বাচন অফিসার ও প্রধান নির্বাচন কমিশন। সহযোগীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা আসছে।

দুদকের তদন্তে এলবার্ট সরকারের পাশাপাশি আরও ৫ জনের সংশ্লিষ্টতা হলেন— ১. মোহাম্মদ মনজুর আলম, সাবেক সচিব (৩২ নং আন্দরকিল্লা), বর্তমান সচিব (দেওয়ান বাজার), ২. আফরোজা বুলবুল, সুগন্ধা আবাসিক, পাঁচলাইশ, ৩. রতন কুমার মল্লিক, কাশীয়াইশ, পটিয়া ৪. মো. শামসুল আলম রানা, মতলব দক্ষিণ, চাঁদপুর ও ৫. সংশ্লিষ্ট একজন আইনজীবী। তাদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করা হয়েছে; বিষয়টি দুদক প্রধান কার্যালয়ে প্রক্রিয়াধীন।

অর্পিত সম্পত্তি দখলের ইতিহাস বিষয়ে দুদক জানায়, ইজিক্যাল পরিবার উনিশ শতকে চট্টগ্রামে ব্যবসা করত এবং আলকরণ এলাকায় ৩টি প্লটে ভবন নির্মাণ করে বসবাস করত। ডেভিড ইজিক্যাল ১৯৩৫ সালে ভারতবর্ষ ত্যাগ করেন এবং আর ফিরে আসেননি। পরবর্তীতে পরিবারসহ লন্ডনে চলে গেলে সম্পত্তিটি অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে সরকারিভাবে রেকর্ড হয়।

২০১৩ সালে এলবার্ট সরকার নিজেকে মেয়ের ঘরের নাতি দাবি করে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ ট্রাইব্যুনালে মামলা করেন। তার জাল নথি সত্য ধরে নিয়ে ২০১৯ সালে আদালত রায় দেন এবং আপিলেও রায় বহাল থাকে। ২০২৪ সালের ৫ মার্চ জেলা প্রশাসন উক্ত জমির দখল এলবার্ট সরকারের হাতে হস্তান্তর করে। দুদকের নতুন তদন্তে পুরো ঘটনাটি প্রতারণার মাধ্যমে ঘটানো হয়েছে বলে প্রমাণ মিলেছে, যার ভিত্তিতেই বর্তমান নিষেধাজ্ঞা ও এনআইডি ব্লকের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • এনআইডি
  • এলবার্ট সরকার

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন