মূল সংবাদে যান
অপরাধ

চসিকে ৪০ কোটি টাকা পৌরকর ফাঁকির অভিযোগে দুদকের অভিযান

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) রাজস্ব বিভাগে ইছহাক ব্রাদার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ও ইন্কনট্রেড লিমিটেড নামের দুইটি প্রতিষ্ঠানের নথিতে ৪০ কোটি টাকা পৌরকর ফাঁকির অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) চসিকের অফিসে অভিযান চালিয়েছে।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
চসিকে ৪০ কোটি টাকা পৌরকর ফাঁকির অভিযোগে দুদকের অভিযান

ওই দুই প্রতিষ্ঠানের পৌরকর মূল্যায়নে ঘষামাজা করে ২০ কোটি টাকা করে ৪০ কোটি টাকা কমিয়ে দেয়ার প্রমাণ পেয়েছে দুদকের তদন্ত কমিটি। বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) দুপুরে দুদকের টিম টাইগারপাসের চসিক কার্যালয়ে এ অভিযান চালায়। এ সময় দুদক কর্মকর্তারা নথি পর্যালোচনা ও চসিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।

এর আগে চসিকের গঠিত তদন্ত কমিটিতে আইন কর্মকর্তা মহিউদ্দিন মুরাদকে আহ্বায়ক করে গঠিত ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটিতে ছিলেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চৈতী সর্ববিদ্যা, শিক্ষা কর্মকর্তা রাশেদা আক্তার, ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির চৌধুরী ও কর কর্মকর্তা আবদুল মজিদ।

দুদকের সহকারী পরিচালক সায়েদ আলম জানান, প্রাথমিক তদন্তে দেখেছি নথিতে ঘষামাজা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের মালিকেরও যোগসাজশ রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। যেহেতু তারা বেনিফিশিয়ারি। সিগনেচার এক্সপার্টদের মতামত নেওয়া হবে। বিস্তারিত তদন্তে ব্যাংকিং হিসাব তদন্ত করা হবে।

জানা যায়, চসিকের তদন্তে ইনকনট্রেডের কর নির্ধারণও ইছহাক ব্রাদার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এর কর মূল্যায়নে উঠে এসেছে এমন অনিয়মের ঘটনা। এতে প্রথমটাতে কর কর্মকর্তা নুরুল আলম ও অবসরপ্রাপ্ত উপ-কর কর্মকর্তা আবদুল কাদের এসব ঘটনায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তাঁদের সহায়তা করেছেন রাজস্ব সার্কেলের সহকারী মঞ্জুর মোরশেদ ও হিসাব সহকারী রূপসী রাণী দে। এ অনিয়মে হোল্ডিং মালিক ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুনও জড়িত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইনকনট্রেডের হোল্ডিং মূল্যায়ন হয়েছিল ২০১৭-১৮ অর্থবছরে, মেয়র ছিলেন আ. জ. ম নাছির উদ্দীন। পরবর্তীতে প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন এর সময় রিভিউ বোর্ডে ঘষামাজা করা হয়। ২০২৩ সালে অনিয়মটি শনাক্ত হলেও তৎকালীন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী কোনো ব্যবস্থা নেননি। বর্তমান মেয়র দায়িত্ব গ্রহণের পর তদন্তের নির্দেশ দেন এবং সেই তদন্তেই পুরো ঘটনা প্রকাশ্যে আসে।

চসিকের ৮ নম্বর রাজস্ব সার্কেলের আওতাধীন দক্ষিণ পতেঙ্গা এলাকার হোল্ডিং নং ৫১৫/এ/৫৯৪ এর জন্য অ্যাসেসর সমীর দত্ত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বার্ষিক মূল্যায়ন করেছিলেন ২৫ কোটি ৬৭ লাখ ৪ হাজার ৭৫০ টাকা। কিন্তু রিভিউ বোর্ডে উপস্থাপনের সময় ফিল্ডবুক ও “পি ফরম” থেকে ‘২’ সংখ্যা মুছে দিয়ে তা দেখানো হয় ৫ কোটি ৬৭ লাখ ৪ হাজার ৭৫০ টাকা। পরে রিভিউ বোর্ড তা আরও কমিয়ে মাত্র ৫৮ লাখ টাকা নির্ধারণ করে। সাদা ফ্লুইড ব্যবহার করে ঘষামাজা করে প্রকৃত মূল্যায়ন পরিবর্তন করা হয়েছে যা সরাসরি জালিয়াতির শামিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

‘ইছহাক ব্রাদার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’-এর হোল্ডিংয়ে ২৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকার কর মূল্যায়ন থেকে ‘২’ মুছে দিয়ে দেখানো হয় ৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। সেখানে জড়িত ছিলেন কর কর্মকর্তা নুরুল আলম, উপ-কর কর্মকর্তা জয় প্রকাশ সেন এবং হিসাব সহকারী আহসান উল্লাহ্। ফিল্ডবুক ও পি ফরমে ঘষামাজা করে ২০ কোটি টাকা কমিয়ে রিভিউ বোর্ডে উপস্থাপন করা একটি অপরাধমূলক কাজ। কর কর্মকর্তা ও উপ-কর কর্মকর্তারা এ দায় এড়াতে পারেন না।

চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে আমরা বদ্ধপরিকর। কেউ দুর্নীতি করে পার পাবে না। তবে পৌরকর নির্ধারণে এত বড় অনিয়ম দেখে আমি হতবাক। সাবেক মেয়র ও প্রশাসকের সময় এ ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু দীর্ঘসময়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এখন যারা জড়িত, তাদের ক্লোজড করার নির্দেশ দিয়েছি। কর্পোরেশনে দুর্নীতির স্থান হবে না।

মেয়র বলেন, এই দুই ঘটনায় দুইটি ২ মুছে ২০ কোটি টাকা করে মোট ৪০ কোটি টাকার কর রাজস্ব হারিয়েছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রাজস্ব ব্যবস্থার তদারকির দুর্বলতা ও নথি জালিয়াতির সংস্কৃতি আবারও সামনে এনে দিয়েছে এই দুটি প্রতিষ্ঠানের তদন্ত। ইনকনট্রেড লিমিটেডের কর নির্ধারণে ঘষামাজা করা একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এতে চসিক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিজেরা অনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছেন।

চসিক সচিব মো. আশরাফুল আমিন জানান, জড়িতদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে আইন কর্মকর্তার মতামত নেয়া হচ্ছে। ২০১৭-১৮ সালে চসিকের শেষ অ্যাসেসমেন্টকে ভিত্তি করে দুই কনটেইনার ডিপোতে অনিয়মটা হয়েছে। ২৬ কোটি এবং ২৫ কোটিকে ঘষামাজা করে ৬ কোটি ও ৫ কোটি দেখানো হয়েছে।

একজন টিও এবং দুইজন ডিটিও সরাসরি দায়ী ছিলেন। হিসাব সহকারীরা বিষয়টি জানতেন। কর্মরত দুইজনকে সাসপেন্ড করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। হিসাব সহকারীদের ওএসডি করেছি। তাদেরও ১০ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়েছে। নোটিশের জবাব দেওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থায় চলে যাব। একজন অবসর নিয়েছেন। অবসরোত্তর বেনিফিটগুলো স্থায়ীভাবে স্থগিত করেছি।

সম্পর্কিত বিষয়

  • চসিক
  • পৌরকর
  • দুদক

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন