সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) দুপুরে চট্টগ্রাম ইপিজেডের একটি পোশাক কারখানায় আগুন লাগে। মুহূর্তেই পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে আগুনের লেলিহান শিখা।
ঘটনাস্থলে পৌঁছে ফায়ার সার্ভিসের অন্তত ১৯টি ইউনিট প্রায় ১৮ ঘন্টারও বেশি সময় চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। অগ্নিনির্বাপনের দীর্ঘ সময় এবং সীমিত সরঞ্জামের ব্যবহার নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে শিল্পাঞ্চলে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর।
বিশেষজ্ঞদেও মতে, বাংলাদেশের শিল্প খাত এখন অগ্নিনিরাপত্তার সংকটে দাঁড়িয়ে। উন্নত প্রযুক্তি না আনলে, আর মানবসম্পদ প্রশিক্ষণ না বাড়ালে বড় কোনো শিল্পাঞ্চলে আগুন মানেই হবে জাতীয় অর্থনৈতিক ক্ষতি। গত ২০ বছরে দেশের ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সক্ষমতা বৃদ্ধির ঘোষণা এসেছে একাধিকবার।
কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। বর্তমানে সারা দেশে ৫০ হাজারের বেশি শিল্প প্রতিষ্ঠান থাকলেও ফায়ার সার্ভিসের নিবন্ধিত আধুনিক ফায়ার স্টেশনের সংখ্যা মাত্র ৫৭২টি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলে রয়েছে মাত্র ১৯টি পূর্ণাঙ্গ স্টেশন, যেগুলোর অধিকাংশেই আধুনিক ফোম সিস্টেম, ড্রোন মনিটরিং বা স্বয়ংক্রিয় আগুন শনাক্তকরণ প্রযুক্তি নেই।
ডেটা বিশ্লেষণ বলছে—গড়ে প্রতি বছর দেশে ২৫ হাজারের বেশি আগুনের ঘটনা ঘটে, যেখানে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বেশি। এগুলোর মধ্যে শিল্পাঞ্চলে ঘটে মোট ঘটনার ২৮ শতাংশ, এবং এর প্রায় অর্ধেকই চট্টগ্রাম ও আশপাশের এলাকায়।
ফায়ার সার্ভিসের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন বলছে—যদি প্রতি জেলায় অন্তত একটি আধুনিক “অটোমেটেড ফোম বেইসড ইউনিট” স্থাপন করা যেত, তাহলে ৪০ শতাংশ ক্ষতি কমানো সম্ভব হতো। ইপিজেড আগুন শুধুমাত্র একটি শিল্প কারখানার দুর্ঘটনা নয় এটি পুরো দেশের শিল্প নিরাপত্তার ঘোর সতর্কবাণী।
কিন্তু বাংলাদেশে এখনো অধিকাংশ অগ্নিনির্বাপন কার্যক্রম চলে পানিভিত্তিক পদ্ধতিতে। অথচ উন্নত দেশগুলোতে ব্যবহৃত হয় অটোমেটেড “ফোম বেইসড ফায়ার সিস্টেম”, ড্রোন নজরদারি, তাপ নির্ণয় সেন্সর, কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস সাপ্রেশন এবং রোবোটিক নোজল। এসব প্রযুক্তি আগুনের উৎস চিহ্নিত করে কয়েক মিনিটের মধ্যেই তা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।
জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ায় শিল্পাঞ্চলভিত্তিক ফায়ার রোবট, তাপমাত্রা সেন্সর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থার ফলে আগুন লাগার পর ৫ু৭ মিনিটের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসকে ২ হাজার ৮৯৪টি আগুন মোকাবেলা করতে হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে বন্দর, ইপিজেড ও বায়েজিদ শিল্প এলাকায়।
চট্টগ্রামে বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ ফায়ার স্টেশন মাত্র ১৯টি। অধিকাংশেই নেই ল্যাডার ট্রাক, ফোম জেট বা উচ্চ ভবননির্বাপণ ইউনিট। ফায়ারবোট থাকলেও তা নৌ-শিল্প এলাকায় সীমিত।
গবেষণায় দেখা গেছে, চট্টগ্রামের ৫০টি গার্মেন্টস কারখানার মধ্যে ৭৫ শতাংশ কারখানায় নেই স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ম সিস্টেম, এবং ৬২ শতাংশ কারখানায় ফায়ার এক্সিট পথ সংকীর্ণ বা অকার্যকর। ফলে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে শ্রমিকদের জীবন রক্ষা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য ঘাটতির মধ্যে অন্যতম হলো- ১. অপ্রতুল ফায়ার স্টেশন কাভারেজ- অনেক শিল্পাঞ্চল থেকে নিকটস্থ ফায়ার স্টেশনের দূরত্ব ১০ কিলোমিটারের বেশি। ২. আধুনিক প্রযুক্তির অভাব- ফোম, গ্যাস সাপ্রেশন, ড্রোন মনিটরিং এখনো সীমিত। ৩. প্রশিক্ষণ সংকট- অধিকাংশ ইউনিটে নিয়মিত আগুন সিমুলেশন ট্রেনিং হয় না। ৪. নিয়ন্ত্রণহীন শিল্প মালিকানা- কারখানা মালিকদের নিরাপত্তা ব্যয়ের অনীহা। ৫. বাজেট সীমাবদ্ধতা- ফায়ার সার্ভিসের বার্ষিক বাজেট আধুনিক সরঞ্জাম কেনার জন্য যথেষ্ট নয়।
প্রাক্তন ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা মেজর (অব.) মো. আলমগীর হোসেন বলেন,“আমরা এখনো ১৯৮০ সালের আগুননির্বাপন ব্যবস্থা ব্যবহার করছি। অথচ শিল্পের প্রকৃতি পুরোপুরি বদলে গেছে। রাসায়নিক, গ্যাস, সিনথেটিক—সবকিছুই এখন আগুনকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলছে।”
