এমনকি জনপ্রিয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম 'দারাজ'-এর মাধ্যমেও এসব জাল নোট বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। প্রতিটি বান্ডিল জাল নোট ছাপাতে খরচ হতো মাত্র ৩০ টাকা, আর সেই বান্ডিল বাজারে বিক্রি হতো সর্বোচ্চ এক হাজার টাকায়। এই চক্রের অন্যান্য সদস্য, সংশ্লিষ্ট প্রিন্টিং প্রেস ও ই-কমার্স মাধ্যমে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে বৃহৎ তদন্ত ও নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিন ধরে এই সিন্ডিকেটটি চট্টগ্রাম থেকে জাল টাকা ছাপিয়ে দেশজুড়ে ছড়িয়ে আসছিল। মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) বিকেলে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র্যাব)-৭ এর একটি দল চান্দগাঁও থানার নূরনগর হাউজিং সোসাইটির সুলতান টাওয়ারের একটি বাসা থেকে চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তাররা হলেন- কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বিলছড়ি এলাকার মো. তানবিজ উদ্দিন (২০) ও চন্দনাইশ উপজেলার বরমা এলাকার মো. আসিফ। তানবিজকে আটকের পর তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আসিফকেও আটক করা হয়।
এসময় র্যাব যে পরিমাণ জাল মুদ্রা জব্দ করে, তার মোট মূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে রয়েছে - ৫৫ বান্ডিল জাল ইউরো, ৪৫ বান্ডিল জাল মার্কিন ডলার, ২১ বান্ডিল জাল দিরহাম, ৪৫ বান্ডিল জাল রিয়াল, ১,০০০ / ২০০ / ৫০ টাকার বাংলাদেশি জাল নোটের বান্ডিল। এছাড়াও উদ্ধার করা হয় - ৯টি মোবাইল ফোন, ৭টি ক্রেডিট কার্ড, একাধিক ল্যাপটপ ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তানবিজ উদ্দিন দাবি করেন, তিনি নিজে জাল টাকা ছাপান না; বরং আন্দরকিল্লার 'অঙ্কুর প্রিন্টার্স' থেকে এসব তিনি সংগ্রহ করেন। তার ভাষ্যমতে, এগুলো শুটিংয়ের জন্য তৈরি করা হয়। সম্প্রতি একটি চিপস কোম্পানির অনুরোধে কিছু জাল নোট সরবরাহও করেছেন। তার দাবি অনুযায়ী, এসব নোট ‘দারাজ’ ই-কমার্স সাইটেও লিস্টেড ছিল।
তানবিজ আরো জানান, “প্রতি বান্ডিল বানাতে ৩০ টাকা খরচ হয়, বিক্রি করি ৬০০ টাকা করে। কিছু বান্ডিল ১ হাজার টাকায়ও লিস্ট করা ছিল। প্রতি বান্ডিলে আমার ৯৭০ টাকা পর্যন্ত লাভ হয়।”
র্যাব-৭ এর অধিনায়ক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, “অপরাধী ধরা পড়ার পর নানা অজুহাত দেয়—এটিও তারই একটা উদাহরণ। সে বলছে শুটিংয়ের জন্য তৈরি, কিন্তু কোন নাটক বা সিনেমায় এসব ব্যবহার হয়েছে, তা জানাতে পারেনি। জাল টাকা তৈরির কোনো বৈধতা নেই। জাল নোট তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। অভিযুক্তরা তা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। এটি একটি বৃহৎ ও সংঘবদ্ধ চক্রের কাজ। এরই মধ্যে সিলেট থেকে একই সিন্ডিকেটের আরও একটি গ্রুপকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে চট্টগ্রামের এই দলের তথ্য মিলে যায়।”
যদিও তানবিজ দাবি করেন সব নোটে “শুটিং পারপাস” লেখা রয়েছে, কিন্তু র্যাব জানায়, জব্দকৃত অধিকাংশ জাল নোটে এমন কোনো চিহ্ন ছিল না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তানবিজ বলেন, “এই নোটগুলো চিপস কোম্পানির অর্ডার ছিল, নমুনা হিসেবে তৈরি হয়েছিল। ডেলিভারি হয়ে গেছে, হাতে কেবল ওয়েস্টেজগুলো ছিল। এগুলোর প্রিন্ট কোয়ালিটিও ভালো না।”
তবে আইনি দৃষ্টিকোণে বিচার করতে গেলে- বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে জাল টাকা তৈরি, সংরক্ষণ ও বিতরণ করা একটি অপরাধমূলক ও জামিন অযোগ্য অপরাধ। এ ধরণের অপরাধের জন্য দণ্ডবিধি অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। কারণ চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা থেকে পরিচালিত এ চক্রটি কেবল নগরজুড়ে নয়, সারা দেশে জাল মুদ্রা ছড়িয়ে দিচ্ছিল, যার প্রভাব অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় মারাত্মক হুমকি।
