মূল সংবাদে যান
অপরাধ

কক্সবাজারের ট্রেন দুর্ঘটনায় পাঁচটি প্রাণের দায় কার?

কক্সবাজারের রামুর ধলিরছড়া রেলক্রসিংয়ে পাঁচটি প্রাণ এক নিমেষে ঝরে গেল। একটি সিএনজি অটোরিকশাকে ট্রেন ধাক্কা দিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেল।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
কক্সবাজারের ট্রেন দুর্ঘটনায় পাঁচটি প্রাণের দায় কার?

রক্ত, মাংস, হাড় আর ভাঙা জীবনের ছিটেফোঁটা ছড়িয়ে পড়ল রেললাইনের দু’পাশে। নিহতদের মধ্যে ছিল ১৩ মাসের শিশু আশেক উল্লাহ—যার অপরাধ কী ছিল? মায়ের কোলে বসে বাবার বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা? প্রতিটি এমন মৃত্যু শেষে একটাই প্রশ্ন ওঠে—“দায় কার?”

রেল কর্তৃপক্ষ বলবে, "ওটা অরক্ষিত রেলক্রসিং। সতর্কতার দায়িত্ব যাত্রীর।" স্থানীয় প্রশাসন বলবে, "আমরা নিরাপত্তা নিশ্চিতে রেলওয়ের সঙ্গে সমন্বয় করি।" আর আমরা সবাই কেবল বলি, “দুর্ঘটনা”। কিন্তু এই ‘দুর্ঘটনা’ শব্দটি কি দায় এড়ানোর চাবিকাঠি নয়?

এই রেলক্রসিংয়ে গেট নেই, গেটম্যানও নেই। অথচ এখান দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য যানবাহন চলাচল করে। এলাকাবাসী বলছে, আগেও একাধিক প্রাণ গেছে এই একই স্থানে। তাহলে কেন আজও কোনো স্থায়ী নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই? কী ধরনের ব্যর্থতা, অবহেলা কিংবা অসংবেদনশীলতা বারবার এ ধরনের মৃত্যুর জন্ম দিচ্ছে?

এই ঘটনার পর স্থানীয়রা বিক্ষোভ করেছেন, চার ঘণ্টা অবরোধ করেছেন পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন। এ বিক্ষোভ কেবল শোক থেকে নয়—এটি একটি প্রতিবাদ, একটি আর্তনাদ: "আমাদের নিরাপত্তা কে দেবে?"

রেলওয়ের ভাষ্য, “রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের পক্ষ থেকে এই দুর্ঘটনার তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই স্থানে ‘নিজ দায়িত্বে পারাপার হোন’—এমন সাইনবোর্ড লাগানো রয়েছে।” এর মানে কী দাঁড়ায়? রাষ্ট্র নিজের দায় এড়িয়ে জনগণের ঘাড়ে মৃত্যুর ঝুঁকি চাপিয়ে দিচ্ছে?

আমরা বারবার দেখি, দুর্ঘটনা ঘটে, তদন্ত কমিটি গঠিত হয়, দুই-একটি প্রতিবেদনের ফাইল স্যাঁতসেঁতে আলমারিতে ঢুকে পড়ে, এবং... সব আগের মতোই চলতে থাকে।

সুতরাং, প্রশ্নটা শুধু রেলওয়ের গাফিলতি নয়, এটা আমাদের শহর পরিকল্পনার, রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতার, এবং নীতিনির্ধারকদের চরম উদাসীনতার প্রতিচ্ছবি।

শিশু আশেক উল্লাহ, তার মা আসমাউল হোসনা কিংবা চালক হাবিব উল্লাহ যদি আজ বেঁচে থাকতেন, তারা হয়তো প্রশ্ন করতেন—"আমরা কারও নাগরিক নই?"

এই প্রশ্ন আমাদের সবাইকে ভাবতে হবে। কারণ পরের বার হয়তো আমরা, আপনি, কিংবা আপনারই পরিবার কোনো ‘অরক্ষিত রেলক্রসিং’-এর খবরে পরিণত হতে পারি।

কক্সবাজার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) জসীম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “দুর্ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। ঘটনাস্থলে মানুষের শরীরের বিভিন্ন অংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। এগুলো সংগ্রহ করে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।”

পরিশেষে বলতে হয়- তদন্ত কমিটি নয়, আমাদের দরকার নীতিগত জবাবদিহিতা। দরকার দ্রুততম সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ রেলক্রসিংয়ে গেট ও গেটম্যান নিয়োগ। তা না হলে এসব মৃত্যু দুর্ঘটনা নয়, প্রশাসনিক হত্যাকাণ্ড বলে বিবেচিত হতেই থাকবে।

উল্লেখ্য, শনিবার (২ আগষ্ট) দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে রামুর রশিদনগর ইউনিয়নের ধলিরছড়া রেলক্রসিংয়ে ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেন এই দুর্ঘটনা ঘটায়। একজন শিশু ও একই পরিবারের তিনজন নিহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন—কক্সবাজার সদরের ভারুয়াখালী এলাকার রেনু আকতার (৩২), রামুর কালিরছড়ার আসমাউল হোসনা (২৭) ও তার ছেলে আশেক উল্লাহ (১৩ মাস), টেক্সিচালক হাবিব উল্লাহ (৪০) এবং আরও একজন যাত্রী।

সম্পর্কিত বিষয়

  • পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেন
  • অরক্ষিত রেলক্রসিং
  • রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা
  • রেলওয়ের গাফিলতি
  • কক্সবাজার

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন